মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার | শুক্রবার, ১০ নভেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 357 বার পঠিত
সাতাশি সালের পর থেকে প্রতি বছর পালন হয়ে আসছে ১০ নভেম্বর। সামনেও হবে অবশ্যই। নূর হোসেন পেশায় ছিলেন একজন অটোরিকশা চালক। আন্দোলনের সময় তিনি বুকে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” এবং পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” স্লোগান লিখে মিছিলে যোগ দেয়া এই যুবক একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন-সংগ্রামে ১৯৮৭ সালের এই দিনটি পরিস্থিতির বাঁক বদলে দেয়। বুকে পিঠ মিলিয়ে জীবন্ত পোস্টারের ওই মৃত্যু তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনকে দেয় নতুন বেগ। তখনকার আওয়ামী লীগ নূর হোসেনকে তাদের যুবলীগ কর্মী দাবি করে এর সপক্ষে একটি আবহ তৈরিতেও সক্ষম হয়। গুলিতে সেদিন আরো নিহত যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের খেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটোর নাম মানুষ ভুলে গেছে। ঘটনার আবহ, প্রেক্ষিত সব মিলিয়ে নূর হোসেনই হয়ে ওঠেন আত্মত্যাগের প্রতীক। শরীরে গণতন্ত্রের বার্তা লেখা এই যুবক গুলিতে নিহত হওয়ার পর সামরিক শাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। ওই চত্বরটির নামকরণ করা হয় নূর হোসেন চত্বর। নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের পতন।
নূর হোসেনের মৃত্যু নিয়ে পরবর্তীতে গল্প-কবিতা-গান লেখার ধুম পড়ে। ক্ষমতাসীনরা বরাবরই এ ধরনের মৃত্যুকে মামুলি বলার চেষ্টা করে। আর নিহতকে প্রমাণ করতে চায় টোটকা-টোকাই ধরনের কিছু। নূর হোসেনকে নিয়েও তা-ই হয়েছে। তাকে ছিনতাইকারি নেশাখোর বলতেও ছাড়া হয়নি। বছর কয়েক আগেও ওই হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকীতে নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর ফেনসিডিলখোর’ বলে কটুক্তি করেছিলেন জাতীয় পার্টির তখনকার মহাসচিব এবং এমপি মশিউর রহমান রাঙ্গা। এমন গালমন্দ শুনে কেঁদেছেন নূর হোসেনের বৃদ্ধা মা। পরে রাঙ্গা এজন্য দু:খ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, শব্দ দুওটা তার মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিল। যদিও এর আগে, জেনারেল এরশাদ ১৯৯৬ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন।
নূর হোসেন নিহত হওয়ার পর দিন, ১১ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে দৈনিক বাংলার শিরোনাম ছিল, “ঢাকায় মিছিল সংঘর্ষ, পুলিশের গুলিতে নিহত ৪”। বাংলাদেশ টাইমসের শিরোনাম ছিল, “থ্রি কিলড, হানড্রেড হার্ট”।
সেই সময়ে এরশাদ সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ তার ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা:১৯৮৩-১৯৯০’ গ্রন্থে ১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর তারিখের আন্দোলন, গুলিতে হতাহতের কথা উল্লেখ করলেও সেখানে নূর হোসেনের প্রসঙ্গে কিছু লেখেননি।
তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে ব্যারিস্টারমওদুদ আহমেদ তার বইতে লিখেছেন, ”বিরোধী দলসমুহের এই কর্মসূচীকে প্রতিহত করার জন্য সরকার দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে জনসমাবেশ ও মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের আটক করা হয়, গ্রামাঞ্চল থেকে লোকজন যাতে শহরের দিকে আসতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে লঞ্চ ও ট্রেনের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নিয়মিত আইন রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিডিআর মোতায়েন করা হয়।”…”সরকারের গৃহীত এসব পদক্ষেপ বানচাল করার জন্য বিরোধী দলগুলো পর্যাপ্ত জনসমর্থন সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জনসভাটি অন্য জনসভার চেয়ে আকারে বড় হলেও তেন কোন সফলতা অর্জন করতে পারেনি।”… ”এভাবে ১০ নভেম্বর সরকার বিরোধী আন্দোলন সরকারের দৃষ্টিতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের তীব্রতা কমেনি, বরং ক্রমশ তা ঘনীভূত হতে থাকে।” … কিন্তু বইয়ের কোথাও নূর হোসেনের উল্লেখ করেননি তখনকার উপ-প্রধানমন্ত্রী, মওদুদ আহমেদ।
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, এরশাদের সময়কাল বইয়ে ড. মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন, নূর হোসেন নিহত হওয়ার পর দিন, ১১ নভেম্বর (১৯৮৭) ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে এক জনসভায় জেনারেল এরশাদ তার পরিবর্তে বিরোধী দলের নেতাদেরই পদত্যাগ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন: ”১০ নভেম্বর বিরোধী দল ৫০ লাখ লোকের ঢাকা সমাবেশ করবে বলে পরিকল্পনা করছিল, কিন্তু তারা ৫ হাজার লোকও আনতে পারেনি।”
তখনকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রেসনোটে বিরোধীদের দেখামাত্র গুলি কারর কথা বলা হয়। ১২ নভেম্বর সংঘর্ষে একজন পুলিশসহ দুইজন নিহত হন। ১০ই নভেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, ”আন্দোলনের নামে পরিচালিত ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় বিপন্ন হয়ে পড়া জনসাধারণের জানমাল ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।… ”শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনজীবনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার আশা করেন যে, সংশ্লিষ্ট সকল মহল ভবিষ্যতে এ ধরণের কর্মতৎপরতা হতে বিরত থাকবেন”।
১৯৯৭ সালে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ নূর হোসেনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা আর অব্যাহত রাখা হয়নি। আওয়ামী লীগ দিনটিকে নূর হোসেন দিবস হিসাবে পালন করতে শুরু করলেও জাতীয় পার্টি এই দিনটিকে গণতন্ত্র দিবস হিসাবে পালন করতে শুরু করে। বিবিসি বাংলায় দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির বছল কয়েক আগের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছিলেন, জেনারেল এরশাদ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন জাতীয় পার্টির সরকারের অনেক মন্ত্রী বিশ্বাস করতেন যে নূর হোসেনকে দিয়ে তাদের নেতার পতন ত্বরান্বিত করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এর পরই জাতীয় পার্টির একটি অনুষ্ঠানে তিনি নিহত তরুণ নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর ফেনসিডিলখোর’ বলে কটূক্তি করার পর প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। পরবর্তীতে চাপের মুখে মশিউর রহমান রাঙ্গা তার এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন।
এ ধরনের ঘটনা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার মাঝেও তারা ফাঁক রাখেন। ঘুরিয়েফিরিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে আবার আগের কথাতেই ফেরত যান। ক্ষমা চান বা না চান, বাস্তবতা হলো যুগে যুগে আন্দোলনকে তাচ্ছিল্য করা ক্ষমতাসীনদের বৈশিষ্ট্য। হতাহতদের মামুলি ভাবা যেন তাদের একটা ধর্ম। আবার আন্দোলনকারীরা কেবল নূর হোসেনদের মতো জীবন বিসর্জনকারীদের দোহাই দেন। নিজেরা নূর হোসেন হতে চান না। চেতনার স্তরটা এমন পর্যায়েই এসে ঠেকেছে।
মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাপোষ্ট
Posted ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১০ নভেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।