মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার | শনিবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২৪ | প্রিন্ট | 318 বার পঠিত
নির্বাচনী ইশতেহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনের আগে দলগুলোর দেয়া ইশতেহার নিয়ে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কারটি কতো ভালো কারটি দুর্বল-এ নিয়ে চলে কথামালা। কিন্তু, এবার ব্যতিক্রম। কে কী ইশতেহার দিল এ নিয়ে কারো গরজ নেই। এটাই অনিবার্য। এবার নির্বাচনে কে জিতবে, তা পরিস্কার। বাকি কেবল আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা। এ মাঝে একটু খটনা লেগে আছে বিরোধীদল নিয়ে। কে হবে বিরোধীদল-এতাটুকু জানার বাকি।
বিজয়ীরা যাদের বানাবে তারাই হবে বিরোধীদল। ভাবনমুনা বা আগের ধারনায় বিরোধীদল করা হবে জাতীয় পার্টিকে। নইলে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র বা ডামিদের বিরোধীদল বানিয়ে দেওয়ার সুযোগও সরকারের আছে। এবার খেলা হবে-ঘোষণা ছিল আগেই। খেলা খানিকটা হয়েও গেছে। কে খেলেছে, কে খেলিয়েছে-এ গণিত কষা শেষ। এখন বাকি শুধু ঘোষণা। এমন খেলো পরিস্থিতির মাঝেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ স্মরণকালের ব্যতিক্রমী ইশতেহার দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য সকল মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করাসহ ১১টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কাছে যা একটি বিশেষ বিশ্লেষণের বিষয়।
বোঝার-জানার- উপলব্ধির অনেক উপাদান লুকিয়ে আছে আওয়ামী লীগের ইশহিতারটিতে। রয়েছে নতুন অনেক কথা। এতে আবারও ক্ষমতায় এলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয় ক্ষমতায় আনতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর ওয়াদা করা হয়েছে। ইশতেহারের শুরুতেই তুলে ধরা হয়েছে ‘আমাদের বিশেষ অগ্রাধিকার’ শিরোনামে ১১ দফা অঙ্গীকার।
১. দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
২. কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
৩. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
৪. লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
৫. দৃশ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শিল্পের প্রসার ঘটানো।
৬. ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৭. নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা।
৮. সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করা।
৯. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
১০. সাম্প্রদায়িকতা এবং সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করা।
১১. সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানোর মতো অঙ্গীকারগুলোর প্রতিটিই সময়ের চাহিদা।
বাস্তবে কী হবে বা এগুলো বাস্তবায়নযোগ্য কিনা, সেটা পরের ব্যাপার। ইশতেহার পাঠে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে কিছু কঠিন বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামীতে দুর্নীতিবাজদের অবৈধ অর্থ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বার্তাটি তীর ছোঁড়ার মতো। সেইসঙ্গে রয়েছে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদ, ঋণ-কর-বিল খেলাপি ও দুর্নীতিবাজদের শাস্তি প্রদানের হুঁশিয়ারিও। এগুলো মোটেই যা-তা বা বাতকে বাৎ কথা নয়। বটতলার মেঠো বক্তৃতাও নয়। দলিল, ডকুমেন্টারি, জাতির কাছে অঙ্গীকারনামা। বক্তব্যের এক পর্যায়ে সরকারের যা কিছু ভুলত্রুটি, তার দায়ভার নিজের ওপর নিয়েছেন শেখ হাসিনা। আর সাফল্যের কৃতিত্ব দেয়ার সময় বলেছেন, সেটি ‘আপনাদের’। এই আপনাদের- এর অর্থ জনগণ। তার ভাষায়: আমাদের ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমরা কথা দিচ্ছি, অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করব।’ বক্তৃতার শেষ দিকে আবার দেশ সেবার সুযোগ চেয়ে বলেছেন, ‘আপনারা আমাদের ভোট দিন, আমরা আপনাদের উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি দেব।’ এ মুহূর্তে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে উল্লেখ করে বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে দেশ। এ উত্তরণ একদিকে সম্মানের, অন্যদিকে বিশাল চ্যালেঞ্জেরও। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে।
আগেরবার ১৮তে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’, যাতে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়টিকে বিশেষ অঙ্গীকারের তালিকায় রাখা হয়েছিলো। সেবার তরুণদের জনশক্তিতে রূপান্তর, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন, দারিদ্র নির্মূল, বিদ্যুৎ জ্বালানির নিশ্চয়তার মতো বিষয়কে বিশেষ অঙ্গীকার তালিকায় রাখা হলেও এবার বিশেষ অগ্রাধিকারের শুরুতেই ’দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার’ সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা। আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহার তৈরি হয়েছে তিনটি নির্বাচনের ইশতেহারের ধারাবাহিকতায়। হুট করে নতুন কিছু আনা হয়নি। আওয়ামী লীগ এখন মনে করে শিল্পোন্নত হওয়ার দিকে যাত্রা শুরুর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষিত জনবল আর অবকাঠামোর যে প্রয়োজনীয়তা ছিলো সেটি অর্জন হয়েছে। এর্ও আগে, আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে যে ইশতেহার দিয়েছিলো তাতে ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা। এরপর প্রতিটি নির্বাচনেই এই ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাকে ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।
এবার ‘ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের’ বিষয়টি সামনে এনে ‘২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২৫, ২০৩১, ২০৪১- সময়রেখার মধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ইশতেহারে স্মার্ট বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে-‘স্মার্ট বাংলাদেশের রয়েছে চারটি স্তম্ভ- স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার ও স্মার্ট সমাজ’।
২০১৮ সালের ইশতেহারে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ছিল ’গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা হবে এবং সংবিধান হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল’। এবারের ইশতেহারে দাবি করা হয়েছে ‘নির্বাচন কমিশন বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ এবং এটি কোনভাবেই সরকারের মুখাপেক্ষী নয়’। ২০১৮ সালের ইশতেহারের মতো এবারের ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতির কথা উল্লেখ করেছে আওয়ামী লীগ। এবার তা এসেছে আরো জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ইশতেহারে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পথে ‘দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের কথা এসছে গুরুত্বের সঙ্গে।
রাজনৈতিক টানাপড়েন, নানা দুর্নীতি-অনিয়ম-পাচার, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, দলীয় দুর্বৃত্তায়নের মাঝে কোন বুদ্ধি বা সমীকরণে আওয়ামী লীগ সমীকরণটি মেলাবে-প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রীর হিতাকাঙ্খীরা বলছেন, তিনি কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনীতি-কূটনীতিতেও কিছু সমীকরণের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তার টানা গত মেয়াদে। সামনে আরো গড়বেন বলে আশাবাদ তাদের। বাকিটা ভবিষ্যৎ।
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলাপোষ্ট
Posted ৮:০০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২৪
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।