মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার | শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 411 বার পঠিত
কেবল নতুন শিক্ষাক্রম নয়, যে কোনো কিছু নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা বেশি হয়ে গেলে মূল বিষয়টা তলিয়ে যায়। কথার চেয়ে আকথা বেশি হয়ে যায়। সমস্যার সমাধান আসে না। আমাদের নতুন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও এ অবস্থা। পরিস্থিতির কারণে এখন যারা এ নিয়ে বোঝেন, দু’চার কথা বলতে পারতেন তারাও চুপ করে আছেন। যারা বিষয়টা তেমন বোঝেন না তাদের কেউ কেউ এ নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। অথচ বিষয়টি কতো গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষাক্রম কারো একার বিষয় নয়। কোনো না কোনোভাবে দেশের সবার বিষয়।
আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি পারতো না এ নিয়ে একটা আলোচনা বা বিতর্কের আয়োজন ? শিক্ষা মন্ত্রনালয়ও করতে পারতো। যারা এই শিক্ষাক্রমের বিরোধীতায় সক্রিয়, তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক হয়ে থাকলে সেটিও পরিষ্কার করে দেয়া যেতো। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা- বিতর্ক বন্ধ করে দিয়ে নয়, বরং আলোচনা- বিতর্কের আয়োজন করে শিক্ষাক্রম নিয়ে জনমানুষের সংশয় দূর করার পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বেশি চাপচাপি বা মুখ বন্ধের চেষ্টা করলে বেশি সন্দেহ তৈরি হয়। বিরুদ্ধবাদীদের বিরোধীতা অযৌক্তিক হলেও তখন হাওয়া পেতে থাকে।
আলোচনার ব্যবস্থা করলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা পাঠ্যক্রমে অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকর কী কী আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলতে পারতেন। পয়েন্ট ভিত্তিক উল্লেখ করতে পারতেন। বলতে পারতেন কোন বইয়ের, কোন পৃষ্ঠায় আপত্তিকর কী আছে? তা না হওয়ায় তর্কের চেয়ে কুতর্ক। আজেবাজে কথাও। বিতর্ক ও কুকথা বাড়তে থাকায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এই ব্যাপারে একটি সতর্কীকরণ বার্তা জারি করে বলেছে- এইসব সমালোচনা মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সমালোচনার বিপরীতে সত্যিকার তথ্যটা কী, সমালোচকরা যে গুজব ছড়াচ্ছে- তা তথ্য প্রমান দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার বিশেষ দায়িত্ব শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষক সমিতিগুলো এ নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক করতে পারতো।, শিক্ষা নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোও পারতো। মিডিয়ারও করার কিছু ছিল। প্রতিটি মিডিয়াতেই শিক্ষা বিট আছে। যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক চলছে শিক্ষা বিষয়ে কাজ করা রিপোর্টার সেগুলো আরো সামনে আনতে পারতেন। সুশীল সমাজ এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোরও ভূমিকা বা অবদান রাখার ব্যাপার ছিল।
নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে অভিজ্ঞতানির্ভর পড়াশোনায় জোর দেওয়া হয়েছে। তা চিরাচরিত পড়াশোনা পদ্ধতির ব্যতিক্রম। স্বাভাবিকভাবেই নতুন বা পরিবর্তিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। কারো কাছে নতুন শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী। কারো কাছে এটি সর্বনাশা। এ শিক্ষাক্রমের সমালোচনাকারী এক গ্রুপ আবার অনলাইনে ব্যাপক সরব। শিক্ষাবিদদের বৃহৎ একটি অংশের মতে, নতুন এ শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন কঠিন, চ্যালেঞ্জিংও।
প্রস্তুতির ঘাটতি আছে। শিক্ষার্থীর চাপ, দক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষা-সহায়ক উপকরণের সংকটও আছে। তাই মানসম্মত প্রশিক্ষণ অবশ্যই দরকার। প্রথাগত মনোভাব বদলাতে ওরিয়েন্টেশন-কাউন্সিলিং লাগবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিখনদক্ষতার যেন পার্থক্য না হয়, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমে নবম শ্রেণিতে বিভাগ পছন্দের সুযোগ পাল্টে তা নেয়া হয়েছে একাদশ শ্রেণিতে। একাদশে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো বিভাগে পড়বে। চলতি বছর প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী বছর বাস্তবায়ন করা হবে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে। এরপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার কথা। তাই আলোচনা করতে চাইলে, মতামতকে গুরুত্ব দিলে সময় এখনো আছে। সেটা নির্ভর করবে সরকারের ওপর।
আগে যেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হতো, সেখানে এখন প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনও পরীক্ষা থাকছে না। আবশ্যিক বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে আগে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী-পিইসি, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট-জেএসসি এবং জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট-জেডিসি পরীক্ষা নেওয়া হতো। এসব পরীক্ষা এখন আর নেই। নতুন কারিকুলামে কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। তার পরিবর্তে আছে ধারাবাহিক মূল্যায়নের নামে অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপন ও প্রজেক্টনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রজেক্ট ও অ্যাসাইনমেন্টের সংযোজন অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। একে বলা হচ্ছে, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাপদ্ধতির জায়গায় একধরনের বৈপ্লবিক চিন্তা। কখন, কোথায় হলো এ বিপ্লবটা? কারা ঘটালেন? চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল চ্যালেঞ্জ হলো মানুষ ও রোবটের বুদ্ধিমত্তায় কে টিকে থাকবে, সেই বিষয়ের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি করণীয় হলো নিজেদের বুদ্ধিমত্তাকে আরও বেশি শাণিত করা, একটি বুদ্ধিদীপ্ত, উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল জাতি তৈরি করা।
বাংলাদেশের জন্ম থেকে অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রতিটি কমিশনের ছিল নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সব শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢাকা শহরের রাস্তার মতো। খোঁড়াখুঁড়ি যেন শেষই হয় না। কখনো কখনো কিছু বিষয় বুঝতে কিছুটা দেরি হলেও একটা সময় বুঝের আয়ত্বে চলে আসে। শিক্ষার বিষয়টা একটু স্পর্শকাতর । সেদিকটা মাথায় রাখা জরুরি। সরকারি মহলের দাবি, এই কারিকুলাম দিয়ে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী তৈরি করা যাবে। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন একলাফে গাছের মগডালে তোলার এ চিন্তার পরিণাম কী হতে পারে? পা ভেঙে পঙ্গু হয়ে শয্যাশায়ী হবে নাতো? খেলার মাঠ প্রস্তুত না করে, খেলা পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ রেফারি নিয়োগ না দিয়ে একদল খেলোয়াড়কে ফাঁকা মাঠে ছেড়ে দিলে কী হয়? এসব বিতর্ক ও তর্কের অবসান জরুরি।
না বললেই নয়, আশির দশক পর্যন্ত সারা দেশে প্রচুর নকল করতে দিলেও মূল্যায়নে কারচুপির আদেশ না দিতে পারায় পাশের হার সেভাবে বাড়তো না। ফলে প্রায় ৭০% শিক্ষার্থী ফেইল করতো এবং তাদের অধিকাংশই আর দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতো না বা দিলেও কৃতকার্য হতো খুব অল্প সংখ্যক। প্রয়োজন ছিল এই অকৃতকার্য বা ঝরে পড়াদের জন্য ব্যাপকভাবে কারিকরী ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার। কিন্তু সেটা যেহেতু ছিল না, তাই অকৃতকার্যরা পারিবারিক পেশায় বা পরিবার-পরিজনের মাধ্যমে বা কারো সাহায্যে বা কোথাও গিয়ে থেকে কোনো কাজ শিখে নিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করতো। এভাবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর স্বচেষ্টায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এখনকার তুলনায় অনেক সহনীয় মাত্রায় থাকতো। কিন্তু নব্বই দশকের শুরুতেই তথাকথিক কাঠামোগত সংস্কার, বাজার অর্থনীতি ইত্যাদির নামে শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের জন্য প্রচুর পাশ করা শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ছিল। স্বীকার-অস্বীকার নয়, এগুলো মনে রাখার বিষয়। সেইদৃষ্টে সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। এসব নিয়ে আলোচনা যতো বেশি হবে সিদ্ধান্ত নেয়া তত সহজ হবে। শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষকের মান, লেখাপড়ার পরিবেশ, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতও আলোচনায় আসা জরুরি। আলোচনায় নিশ্চয়ই শিক্ষার সাধারণ ধারাকে কারিগরী ও কর্মমুখী ধারায় রূপান্তরে বিষয় নির্বাচন, শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাসহ সকল আয়োজনের কথা আসবে।
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাপোষ্ট
Posted ৫:৪২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।