অধ্যাপক ডাক্তার শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী | মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | প্রিন্ট | 771 বার পঠিত
এবার আর বিকল্প প্রস্তাব বা রেসিপি এলো না। পেঁয়াজ-মরিচ-তেল ছাড়াও রান্নার পদ্ধতি বাতলানো হয়নি। চাল ছাড়াও ভাত বা সবজি ছাড়াও তরকারি রান্না শেখানোর একটা অপেক্ষা কিন্তু ছিল। সে রকম কোনো রেসিপি আসেনি। এসেছে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোয় জড়িতদের গণধোলাই দেয়ার তাগিদ। সেই জড়িতদের চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। তারা প্রথমত আন্তর্জাতিক মহল। দ্বিতীয়ত নির্বাচনের বিরোধীতাকারীরা। দেশে মার্চে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছে’- নির্বাচনের আগে নিজের করা এমন মন্তব্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্র ছিল, ষড়যন্ত্র আছে। জার্মানিতে ‘মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন’ নিয়ে শুক্রবার গণভবনে প্রথাগত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনটা যাতে না হয়, তার জন্য একটা বিরাট চক্রান্ত ছিল। ‘আমি কারো নাম বলতে চাই না’ মন্তব্য করে আদতে বলার কিছু বাকি রাখেননি। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টির কথা উল্লেখ করে এও বলেছেন- ‘কথায় তো আছে, যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজা পুণ্য দেশ’। মানে মাঘের শেষে বৃষ্টি হলো, ফাল্গুনের শুরুতে বৃষ্টি হলো। খাদ্যপণ্য উৎপাদনে অসুবিধা হবে না। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গত ১৫ বছরে দেশের উন্নয়নের বর্ণনাও দেন প্রধানমন্ত্রী। মানুষ পেট ভরে খেতে পারছে দাবি করে বলেছেন- ১৫ বছর আগে ভাতের জন্য হাহাকার ছিল। একটু নুন ভাত, ভাতের ফ্যান চাইত, এখন তো ভিক্ষা চায় না।’ বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, এর পেছনে সরকার উৎখাতের আন্দোলনে জড়িতদের কারসাজি আছে। এর আগে এরকম পেঁয়াজের খুব অভাব, দেখা গেল বস্তাকে বস্তা পচা পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছে। এই লোকগুলোকে কি করা উচিত প্রশ্ন রেখে নিজেই জবাব দেন- এদের গণধোলাই দেয়া উচিত। কারণ সরকার করলে বলবে সরকার করছে। পাবলিক করলে কিছু বলতে পারবে না।
টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ফেরত পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলন। জার্মানির মিউনিখের এই নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ হয়। সেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, সে-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘একটি দেশে নির্বাচনের রেজাল্ট ডিক্লেয়ার করতে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগলেও তাদের ইলেকশন ফ্রি-ফেয়ার। আর বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজাল্ট এসে গেল, সেটি ফ্রি-ফেয়ার না। সুতরাং এই রোগের কোনো ওষুধ আমাদের কাছে নেই।
সাদা চোখে সুস্থ রাজনীতি-সুষ্ঠু নির্বাচনের ওষুধের দেখা মিলছে না সত্য। কিন্তু, নিত্যপণ্যের বাজারের অসুখ সারানোর ওষুধও কি থাকতে নেই? অসুখ সারানোর দৃশ্যত চেষ্টা আছে। আবার সমস্যা অস্বীকারের প্রবণতাও ব্যাপক। এর আগে, বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে, মানুষ চাইলে এখন তিন বেলাই মাংস খেতে পারে- ধরনের কথা শুনিয়েছেন মহোদয়-মহাশয়রা। সবশেষে যোগ হয়েছে ‘মানুষের হাতে এখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা হয়ে গেছে’। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের আগের দিন কথাটি বলেছেন নতুন কেবিনেটের মধ্যে প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে নতুন মুখ আহসানুল ইসলাম টিটু। তিনি নিজে ব্যবসায়ী ছাড়াও আলোচনায় থাকার আরেক কারণ তাকে দেয়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রী নেই। এ মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী টিপু মুনশি নিয়মিতই ছিলেন আলোচনায়। তিনিও দেশের তারকা ব্যবসায়ী। এখন আছেন বাণিজ্যমন্ত্রনালয়েরই সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে। তার আলোচনায় থাকার কারণ ছিল কিছুটা ক্রিয়াকর্মের জেরে। কিছুটা মুখদোষের কারণে। মুখের কারণে নিয়মিত ভাইরাল থেকেছেন তিনি। তিনি কোনো পণ্যের দাম কমবে বলে আশ্বাস দেয়ার পরপরই সেটার দাম বেড়ে যেতো। বলতে বলতে এক পর্যায়ে বলেই ফেলেছিলেন বাংলাদেশের ১৭ কোটির মধ্যে ৪ কোটি মানুষ ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে জীবন কাটায়। বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সরকারের ক্ষতি হয়ে যাবে এমন কথাও বলেও আলোচনার ভিন্ন উচ্তায় উঠেছিলেন টিপু মুনশি। সেই সিন্ডিকেট সদস্যরা সরকারি ঘরানারই বিশিষ্টজন। এখন তাদের গণধোলাইতে ফেলা হবে?
আহসানুল ইসলাম টিটো প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাতদ্বিরে দৌড়াদৌড়ি করছেন। নিজে আলোচিত ব্যবসায়ী হয়েও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত হুমকি-ধমকি, অভিযান জোরদারের পদক্ষেপে তিনি বেশ ভাইরাল হচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে জানালেন, কিছুদিনের মধ্যে সিন্ডিকেট দমিয়ে দেবেন। আরেক পর্যায়ে বলেছেন, জুন-জুলাইতে সিন্ডিকেট নামটিই থাকবে না। জুন-জুলাইর আগ পর্যন্ত তাহলে কেন থাকবে? এই কয়েক মাস আখেরি ছাড় দেয়া হচ্ছে? এরপর গণধোলাই বা শায়েস্তা করা হবে? এ ধরনের প্রশ্ন আপনাআপনিই এসে যাচ্ছে। তারওপর ‘দেশে মানুষের হাতে টাকা বেশি হয়ে গেছে’ মন্তব্যের মাধ্যমে মানুষের পকেট চেকিংয়ের তথ্য জানান দেয়া নিয়েও প্রশ্ন আছে। ২২ জানুয়ারি মানুষের পকেট চেকিংয়ের তথ্যদানের দিনটিতে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করে চিনি-খেজুরসহ রমজানের অপরিহার্য পণ্যের দাম কমার কোনো আশ্বাস আদায় করতে পারলেন না বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী টিটো। কিন্তু, মানুষের পকেট চেকিং করতে পেরেছেন। সেদিনের বৈঠকে উল্টো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে হঠাৎ অভিযান বন্ধের দাবি মেনে নিতে হয়েছে তাকে। বৈঠকটিতে ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার কথাও শোনান। দেন ভোগান্তির ফিরিস্তিও। সেইসঙ্গে দাম কমার বদলে চিনি-খেজুরসহ রমজানে জরুরি কিছু পণ্যের দর উল্টো বাড়ার ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন তারা। দাম নিয়ন্ত্রণের নামে নিত্যপণ্যের দোকানে অভিযান চালানো হবে না মর্মে ব্যবসায়ীদের অভয় দেন প্রতিমন্ত্রী। ধর্মের ভয় দেখিয়ে হেদায়েতের চেষ্টায় ব্যর্থ তো হয়েছেনই। দিনটিতে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি আছে, কিন্তু মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে না। এখন এলো গণধোলাই তত্ব। সঙ্গে মানুষের পহাতে বেশি টাকার তথ্য।
চাল-তেল বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে বড় রকমের ঐতিহাসিক আইটেম। দ্রব্যের মধ্যে চাল বড় স্পর্শকাতর। চাল থেকেই হয় ভাত। আর ভাতের অধিকারই এক পর্যায়ে ভোটের অধিকারে রূপ নিয়ে অনিবার্য করেছে ঐতিহাসিক একাত্তর তথা মুক্তিযুদ্ধকে। বাংলায় সুদিনের উদাহরণ খুঁজতে এখনো শায়েস্তা খাঁর আমলকে সামনে নিয়ে আসা হয়। তখন এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত বলে প্রতিষ্ঠিত। আর পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসন বোঝাতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি মণ চাল ৫০ টাকা ও পশ্চিম পাকিস্তানে ১৮ টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য হাজির করা হতো। রাজনৈতিকভাবে সরকার নির্ভার। কোনো প্রতিপক্ষ নেই। রাজনীতির বাইরে বাকি থাকছে অর্থনীতি। আর অর্থনীতির ব্যাপক অংশ নিত্যপণ্যের বাজার। খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর ওয়াদাবদ্ধ সরকার। এ ওয়াদা বাস্তবায়নে বেশি সম্পৃক্ত অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, কৃষিসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় নতুন সরকারের শপথের পরদিনই চালসহ কিছু নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ চড়েছে। এ নিয়ে দোকানদার, পাইকার, আড়তদারদের পাল্টাপাল্টি দোষারোপ ভিন্ন কিছুর বার্তা দেয়।
খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দামে নিয়ন্ত্রণহীনতার এক রেকর্ড পার করছে বাংলাদেশ। আলু-ডিম-পিঁয়াজের দাম বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি সিন্ডিকেট সম্প্রদায়ের কিছু চুনোপুঁটিকে ধরা হলেও হোতারা থেকেছে অধরা। যেই মন্ত্রী বলেছিলেন, সিন্ডিকেটকে ধরা যাবে না, ধরলে সরকার ঝামেলায় পড়বে- সেই মন্ত্রী এবারের মন্তিসভায় নেই। আবার যেই প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, কয়েক মন্ত্রীও আছেন সিন্ডিকেটের মধ্যে- সেই প্রতিমন্ত্রীরও জায়গা হয়নি নতুন মন্ত্রিসভায়। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সিন্ডিকেট নামে পরিচিতরা দেশের বাইরের কেউ নয়। অজানা-অচেনা-অদেখাও নয়। চাল, পেঁয়াজ, ডিম, তেল, আলু থেকে লতি-শুটকি পর্যন্ত তাদের হাত থাকলেও ওই হাত সরকারের হাতের চেয়ে বড় নয়। সামনে রোজা। সময়টা স্পর্শকাতর। তেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরের দাম যেনো নতুন করে না বাড়ে সেদিকে নজরদারির বার্তা দেয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তারওপর উল্টাপাল্টা কথার ধুম।
লেখকঃ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক আহ্বায়ক : সিলেট মহানগর বিএনপি |
Posted ১২:৩৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।