এস এম তানবীর আলম সিদ্দিকী | বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 590 বার পঠিত
দেশকে গুজবের স্বর্গরাজ্য করে তুলেছে গুজববাজরা। তারা দমছেই না। বড় জোর মাঝেমধ্যে দম নেয়। বিরতি দিয়েই আবার মাঠে নামে। আজ এটা, কাল সেটা দিয়ে দেশকে এবং দেশের রাজনীতিকে ভাসিয়ে দেয় গুজবের ফানুসে। গুজবকাণ্ডে তারা ব্যবহার করে ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়ার্টসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় স্যোশালমিডিয়াকে। নির্বাচন সামনে রেখে গুজবের তাওয়ায় নতুন করে তাপ দেয়া হচ্ছে। রটানো হচ্ছে এন্তার রসালো যতো কিচ্ছা।
গুজব-গুঞ্জন কখনো কখনো কখনো বাস্তব হয়ে যাওয়ার ঘটনা কখনো কখনো বাংলাদেশে ঘটার ইতিহাস আছে। বলা হয়ে থাকে যা কিছু রটে কিছু না কিছু বটে। কিন্তু এবার রেকর্ড ফেল। কিছুই ফলছে না এবার, কেবল মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়া। গত মাস কয়েকের গুজবগুলোর বেশির ভাগই সরকারকে টার্গেট করে। ব্যক্তিগত বিষয়াদি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দেশের চিন্তাশীল মানুষকে নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে রগরগা কল্পকাহিনী। সরকারের দিক থেকে এসব গুজব-অপপ্রচার শক্ত হাতে ঠেকানোর হুঙ্কার থাকলেও সাফল্য কম।
গুজববাজদের রুখতে রুখতে প্রশাসনের বাইরে কাজ করছে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন-সিআরআই’র টিম। সরকারবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জবাব, তথ্য এবং সরকারের উন্নয়ন চিত্র জানান দিচ্ছে তারা। কিন্তু, গুজবের জোয়ার দৃষ্টে তা অনেকটাই অকুলান। বিপরীতে গুজব রটনাকারীদের কাজের আওতা বিস্তর-ব্যাপক। রাজনীতি, ধর্ম, কূটনীতি, অর্থনীতি এমন কি শিক্ষা-খেলাধুলা সেক্টরও বাদ দেয় না তারা। পদ্মা সেতুতে মানুষের কল্লার জন্য ছেলে ধরা সন্দেহে বেশ ক’জনকে গণপিটুনিতে হত্যা, ব্যাংক রিজার্ভ শেষ, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো হয়ে গেছে থেকে শুরু করে সরকার পতনের দিন-তারিখ পর্যন্ত বাজারজাত করা হয়েছে। দিন শেষে তারা ব্যর্থ হলেও সময়ে সময়ে সফল হয়েছে, মানে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছে। দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পেরেছে। আবার তাদের গুজব ক্যারিশমায় মুগ্ধ ও সাময়িক পুলকিত বিরোধীদলও কিছুদিন পুলক পেয়েছে। পরিণতিতে মাঠে মার খেয়েছে।
গুজববাজরা বিরোধীদলকে হাওয়ায় ভাসাতে পেরেছে। উপরে-উপরে ঘটনার ঘনঘটার মাঝে দেশের ভেতর ও বাইরের কিছু ইউটিউবার নানা গরম কথায় মুখরোচক ব্যাখ্যায় দর্শক বাড়িয়ে নিজেদের ব্যবসা লুটেছে কয়েকদিন। আন্দোলনেরও সাড়ে সর্বনাশ করেছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই মার খেলো, আরেকদিকে ইউটিউবারদের দুরে বসে ঘি মধু খেয়ে নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত হয়েছে। গুজবের কারবারিরা সরকার পতন, স্যাংশন, ভিসা বাতিলের তথ্য দিয়ে গেছে অবিরাম। বিএনপি কর্মীরা সেগুলো আমলে ও বিশ্বাসে নিয়ে জনমের মার খেয়েছে। অতিউল্লসিত হয়ে পরে বুঝতে বুঝতেই তারা কেবল চোখে অন্ধকার দেখেছে।
তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করেছে। এখন পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের চেনাজানা আপনজন বা অপরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান ও তথ্যের বিনিময় করতে পারে খুব সহজেই। প্রযুক্তির এই উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ ও সাবলীল করেছে। গোটা মানবজাতিকে গতিশীল করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে বিভ্রান্তও করছে। একটি শ্রেণি স্বার্থ হাসিলের জন্য সমাজে ভুল ও মিথ্যা কিংবা আংশিক মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে।
পজিশন-অপজিশন কারো জন্যই গুজব শুভ নয়। এতে সাময়িক কোনো পক্ষের পুলক মিলতে পারে। কিন্তু, আখেরে তা বুমেরাং হয়। বড় ক্ষতিটা হয় দেশের-সমাজের। যে কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ও অপপ্রচার রুখতে শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি উঠেছে বহুদিন আগে থেকেই। কিছু কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন ফ্লাটফর্ম পরিণত হয়েছে গুজবনির্ভর অপপ্রচারের আখড়ায় । একের পর এক কল্পকাহিনি জন্ম দিয়ে তা ভাইরাল করছে দেশ-বিদেশে। নামে-বেনামে তাদের ইউটিউব চ্যানেল, আইপি টিভি, অনলাইন পোর্টালের ছড়াছড়ি। পেজ, গ্রুপ, ইভেন্ট খুলে যে যার ইচ্ছামতো মনের মাধুরী মিশিয়ে নানা অপপ্রচারে লেগে আছে। তথাকথিত ব্রেকিং নিউজের নামে সকাল-বিকাল নানা গুজবের ভিডিও বানানো হচ্ছে। হঠাৎ আবিষ্কৃত এসব গায়েবি খবর তৈরি করে নিমেষেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব অপপ্রচার সরল ও নিরীহ জনগণকে প্রভাবিত করছে। সরল মানুষ না বুঝে তাদের বিশ্বাস করছে। এসবের নেপথ্যে যে বড় ধরনের ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম জড়িত তা তাদের বোধগম্য নয়। অনেকের মধ্যে নিজের বিশ্বাস প্রচারের প্রবণতা দেখা যায়, যারা প্রচারিত কোনো সংবাদ নিজের মত, মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুকূলে হলে তা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করে না। পাওয়ামাত্রই প্রচার শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত অনেক সংবাদের সঙ্গে সামাজিক স্বার্থ জড়িত থাকে। এসব সুযোগই নিচ্ছে গুজববাজরা।
ভুয়া আইডি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ার কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংঘটিত অপরাধ দমনে আমাদের স্থানীয় আইন সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। বাস্তবতা বুঝেই তারা সামনে আগোয়ান। সাইবারজগতের বিস্তার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। দিন যত যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ এর সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে মোবাইল প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ইন্টারনেট সুবিধা সহজীকরণ হয়েছে। এর ভালো দিকের সঙ্গে মন্দ দিক বেশি যোগ হয়ে গেছে। এমন সম্ভাবনাকে নিয়ে আসা হয়েছে শঙ্কার বিষয়ে। সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা তথ্য-প্রযুক্তি যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এখন সবার হাতে, মোবাইল, ইন্টারনেট—সব কিছুই। তথ্য-প্রযুক্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইম কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধও বাড়ছে। আবার এ কথাও সত্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও মিথ্যাচার অথবা অপরাধ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটা বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বের অনেক দেশকেও এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কেবল আজকে নয়, আগামীতেও সাইবারজগতের কী ধরনের বিস্তার ঘটবে, তা এখনই ভাবতে হবে। যে ভাবনা ভর করেছে উন্নত বিশ্বেও। বিভিন্ন দেশে এরইমধ্যে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে ইউটিউব-ফেসবুক, টুইটারের মতো স্যোশালমিডিয়াকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। তারা রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসায় গুজব ও সামাজিক অস্থিরতার লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে।
লেখকঃ সম্পাদক, বাংলাপোষ্ট
Posted ৭:১৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।