নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর ২০২৩ | প্রিন্ট | 538 বার পঠিত
মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস তার কথায় অবিচল। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবারও তার কথা পরিস্কার করলেন। ঘুরিয়েফিরিয়ে বললেন আগের কথাই-গণমাধ্যমকে মতামত প্রকাশে বাধা দিলে প্রয়োগ হবে ভিসা নীতি। আগেও তিনি একথাই বলেছিলেন। কিন্তু, আমরা কেউ বুঝলাম গণমাধ্যমের ওপরও ভিসানীতি প্রয়োগ হবে। কেউ বুঝলাম, সাংবাদিকরাও ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পড়বে। এ ধরনের বুঝ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলো। গরম শিরোনামও হলো।
পরিস্থিতির অনিবার্যতায় শুরু হলো তার মুণ্ডুপাত। সমানে গালিগালাজ। শোকজ ধরনের চিঠির আক্রমনও। বাধ্য হয়ে তিনি ব্যাখ্যা দিলেন। জানালেন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমকে নিজস্ব মতামত প্রচার থেকে বিরত রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপরও মার্কিন ভিসানীতি প্রয়োগ হবে।
চিঠিতে এও বললেন, ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে যারা বাধাগ্রস্ত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলে যাব এবং এসব ব্যক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নীতি প্রয়োগ করবে।’ পিটার হাস আরও বলেন, সেন্সরশিপ আরোপ, ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করা এবং সাংবাদিকদের হয়রানি করতে কোনো সরকার তাদের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করলে অতীতের মতোই যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে উদ্বেগ জানানো অব্যাহত রাখবে। এমন পরিস্কার ব্যাখ্যার পরও দমছি না কেউ কেউ। বলছি, বিদেশি এই কূটনীতিক আমাদের চোখ রাঙাচ্ছেন। তা বরদাশত করা হবে না।
মার্কিন ভিসানীতির ঘোষণা অনুসারে, নির্বাচনে বাধা দানকারী বাংলাদেশের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা বা কর্মচারী, সরকারের সমর্থক এবং বিরোধীদলীয় সদস্যরা এই ভিসানীতির অন্তর্ভুক্ত। তা শুধু ভবিষ্যতের ভূমিকার জন্য প্রয়োগ হবে না, অতীতও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় থাকবে। এখানে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়া প্রাসঙ্গিক নয়। অন্য অনেক দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ক্ষেত্রে এমনিতেই সাংবাদিকদের অনুমতি অন্যদের থেকে আলাদা, যা ‘জে-ভিসা’ নামে পরিচিত। সাংবাদিকতার কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে কাজের বিষয় ও ধরন জানাতে হয়। জে-ভিসার বদলে অন্য কোনো ভিসায় সে দেশে সাংবাদিকতার কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। এ রকম ঘটনায় দেশটি থেকে ফেরত পাঠানোর দৃষ্টান্তও রয়েছে।
মার্কিন ভিসা নীতির প্রভাব কোথায়, কেমন হবে, সে বিষয়ে ধারণা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকবে। আরেকটি বিষয় যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, কে তাদের ভিসানীতিতে পড়েছেন বা পড়বেন, তা কেবল তিনিই জানবেন। বিষয়টি তারা এর বাইরে কাউকে জানান না। কিন্তু, দেশে সমানে নানান জনের নাম প্রচার হয়ে চলছে। স্যোশালমিডিয়ায় নাম ফাঁসের এক উৎসাব চলছে। আবার নিজ থেকে নাম প্রকাশের আজগুবি কাণ্ডও এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের মধ্যে এর ছাপ না পড়াই কাম্য।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৪ এবং ২০১৮ পরপর দুটি নির্বাচনী প্রহসনে মানুষের অবাধ ভোটাধিকার হরণের ঘটনা না ঘটলে এই ভিসানীতির পর্বটি নাও আসতে পারতো। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি আমাদের জন্য অপমানের। কারণ, যারা ভিসানীতিতে পড়ছেন তারা বাংলাদেশেরই । তাদের নামের সঙ্গে চলে আসে বাংলাদেশের নামও। এর শিকার হচ্ছেন এরপরও ভিসা রেস্ট্রিকশনের বদৌলতে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে মন্দ কী? সেটা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংবাদিক ও সংবাদপত্র প্রকৃত খবর প্রচার না করে কোনো রাজনৈতিক দলের তোষামোদ করে বা প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে জনমনে ভীতি সঞ্চার করে বা করার চেষ্টা করলে তার দায় কিভাবে মেটানো যাবে? যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওই ব্যক্তিদের এই পথ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হলে সেটাও গণতন্ত্রের জন্য সহায়কই হবে।
বাংলাদেশ যে বিশ্ব তাপ-চাপের ফাঁকে পড়ে গেছে, তা গোপন রাখার কোনো সুযোগই আর নেই। সামনের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর বার্তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ। যুক্তরাষ্ট্র হাল ছাড়ছে না একটুও। তা জানিয়েও দিচ্ছে নিয়মিত। মাঝেমধ্যেই মার্কিন হেভিওয়েটরা ছুটে আসছেন। তাদের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ থাকছেই। দেশটির ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত পিটার হাস পরিশ্রান্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে। বাংলাদেশের পজিশন-অপজিশনও ছুটছে মার্কনিদের নেক নজরের মোহে। পিটার হাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, হস্তক্ষেপ নয়। সেইসঙ্গে যোগ করেন- নির্বাচন যেন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তার কথাও পরিস্কার। এমন পরিস্কার বিষয়ে সাংবাদিকদের কী দরকার গা মাখানোর? হতে পারে বিশ্বরাজনীতির বর্তমান সন্ধিক্ষণে নিরপেক্ষ থাকার দিন শেষ। বাকিটা ভবিষ্যৎ বা পরবর্তী পরিস্থিতির অপেক্ষা। সেখানে বাংলাদেশ এখনো নো রিস্ক জোনে।
বিশ্ববাস্তবতায় দুই নৌকায় পা রাখার কঠিন ঝুঁকির বিপরীতে বাংলাদেশ পা রাখছে প্রায় সব নৌকাতেই। মাঝেমধ্যে গোলমাল বাঁধলেও, টেনে আনতে ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা হলেও ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রকে আয়ত্বে রাখার চেষ্টায় এখন পর্যন্ত সফল বাংলাদেশ। ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব’ পররাষ্ট্রনীতির এই সূত্রে বাংলাদেশ সবদিকেই থাকার চেষ্টা করছে। ভারতের সঙ্গে মিতালী তথা ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা সরকারের বলতে হয় না। তা মানুষের মুখে-মুখে। চলমান বিশ্বপরিস্থিতিতে তা নতুন করে আলোচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে উপনিবেশগুলো ভেঙ্গে বেশ ক’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বিগত স্নায়ু যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাকিস্তানসহ বহু দেশ ভেঙ্গে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এবারের স্নায়ু যুদ্ধের সময় দেশ ভাঙ্গা গড়ার খেলা শুরু হয়েছে ইউক্রেন দিয়ে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে, মিয়ানমার এবং ভারতের উওর পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন প্রকট হয়ে উঠছে। খালিস্তান আন্দোলনটি নতুন করে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কানাডায় খালিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যায় তা নতুন রুপ নিয়েছে। এসব ঘটনার মাঝে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে বড় দুই দলের জনগণের বদলে অতিমাত্রায় বিদেশ নির্ভরতা বাংলাদেশকে খাদে ফেলার শঙ্কা জাগাচ্ছে। পেশাদার তথা কর্মজীবী সাংবাদিকদের এ খাদের ধারেকাছে ঘেঁষাও মানায় না।
লেখক : এস এম তানবীর আলম সিদ্দিকী
সম্পাদক, বাংলা পোস্ট
Posted ১০:২১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।