নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৩ | প্রিন্ট | 400 বার পঠিত
দেশে পঁচাত্তর পূর্ববর্তী পরিস্থিতি বিরাজমান বলে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। দলীয় সভায় বার্তাটি দিয়ে ব্রাসেলসে গেছেন তিনি। এরইমধ্যে দেশেও ফিরেছেন। তবে, এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেননি। হাই-ভোল্টেজ সতর্কবার্তাটির নেপথ্য তথ্য অস্পষ্ট । তিনি বলেননি, কারা পঁচাত্তর পূর্ববর্তী পরিস্থিতির আয়োজক বা হোতা? সাদা চোখে তা অদৃশ্য। কিন্তু, জ্ঞানমানরা নানানভাবে এ ভয়ের বাস্তবতা মেলানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু, সমীকরণ মিলছে না। দ্রব্যমূল্য এবং লুটপাট ছাড়া পঁচাত্তর পূর্ববর্তী সিনড্রম দেখছেন না। বাড়তি হিসাবে যোগ হয়েছে পাচার ও বিরোধীদল দমন। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিরাগভাজন হওয়া। তাই বলে এতে দেশে পঁচাত্তর পূর্ববর্তী অবস্থা হয়ে গেছে বা যাবে, তেমনটি ভাবতে খটকায় পড়ছেন অনেকে।
এর আগেও সামনে ভয়ানক অঘটনের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একনেকের এক বৈঠকেও ‘আঘাত’ শব্দ যোগ করেছেন। বলেছেন, সাবধান হতে। বিরোধীমত নিয়ন্ত্রণ বা দমনে শেখ হাসিনা জীবন্ত কিংবদন্তী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুও এভাবে পারেননি। যেই জাসদ বঙ্গবন্ধুকে জীবন্ত অবস্থায়ই তেলে পুড়িয়ে মারার দশা করেছিল সেই জাসদ এখন বহুধাবিভক্ত। দুয়েকটি ভাগ বর্তমান সরকারের অধীনস্ত-পোষ্য। কিছু না দিলেও আওয়াজ করার সাধ্য নেই তাদের। রাজপথের বিরোধীদল বিএনপিকে সরকার গণনায়ই আনে না। সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টি সরকারের মিঠামণ্ডায় বুদ। মাঝেমধ্যে ক্ষুদ-কুড়া দিলেও চলে। কখনো কখনো আর না দিলেও সমস্যা হয় না। সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকা ছাড়া দলটির করনীয় কিছু নেই। নানা ইস্যুতে গরম কথা বলে অস্তিত্ব জানান দেয়াই সার। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর খোল-নলচা ভেঙে দেয়া হয়েছে। হেফাজত -খেলাফত নানা ভাগে সরকারের দয়ায় টিকে আছে দম নিয়ে। তাহলে ভয়টা কোন জায়গায়? –এ প্রশ্নের জবাব নেই।
তারেক রহমান আতঙ্কও মাঝেমধ্যে কাবু করছে সরকারের কোনো কোনো মহলকে। নোবেলজয়ী ডক্টর ইউনূসকেও টেনে আনা হয় সন্দেহের তালিকায়। তা রীতিমত ফোবিয়া মতো। কোথাও আগুন লাগলে বা প্রাকৃতিক অঘটন ঘটলেও তারেক, ইউনূস জুজু পেয়ে বসে সরকারের কোনো কোনো মহলকে। কূলকিনারাহীন বিরোধীদল বিএনপির একটি গ্রুপের জন্য স্বস্তির বিষয়। এতে তাদের মধ্যে বেশ তৃপ্তি। সরকার তাদের নেতাকে ভয পায় জেনে নিজে নিজহে আনন্দ আবিস্কার করে। তাদের ধারনা- শক্ত বিরোধী দল না থাকাতে মানুষ সয়ে যাচ্ছে। সরকারও লাগাতারভাবে লায় পাচ্ছে। উৎরে যাচ্ছে। তাদের এই বোধ ও সেন্টিমেন্ট নিয়ে নীরব গবেষণা চলছে বিএনপির অভ্যন্তরে।
এ ভাবনা-চিন্তারমাঝেই এবারের দৃশ্যায়নটির তীব্রতা বেশি। নির্বাচন ও বিরোধী দলের চূড়ান্ত আন্দোলন ঘিরে প্রবল বেগে চলছে বিএনপি নেতাদের মামলার বিচারকাজ। এসব মামলার বিচার কার্যক্রমের গতি সুপারসনিক টাইপের। তা রাতেও চলমান। শতাধিক মামলার এমন গতিময়তা। রাজনীতির মাঠকে আপাতত বিদায় দিয়ে দণ্ড মাথায় নিয়ে তাদের কারও কারও গন্তব্য চৌদ্দ শিকে। সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীর নামে মামলা দেড় লক্ষাধিক। নতুন-পুরোনো মামলার মিশেলে আদালত আঙিনায় চক্কর দিতে দিতেই ঘাম ছুটছে তাদের। কাঠগড়া, হাজিরা, জামিন– এসবই আসামিদের এখনকার যাপিত জীবন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক আর কর্মজীবন হয়ে গেছে তছনছ। নতুন করে ভর করেছে মামলার সাজার শঙ্কা। লক্ষণটি মোটেই শুভ নয়। রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতিসহ দেশের যাবতীয় দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব পরিস্থিতি আরো ভিন্ন। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় বাজার। এই হাটের হাটুরি হতে আগ্রহ সুপার পাওয়ার প্রায় সব দেশেরই। বাংলাদেশ ওই তিন-চার শক্তির পরোক্ষ কেন্দ্র হয়ে উঠতে উঠতে এখন বেশ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠছে। মাত্রাগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা বেশির চেয়েও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এর সরাসরি শিকার ক্ষমতাসীনরা।
হেফাজত, জামায়াত, ডান-বাম ইত্যাদি হ্যান্ডেলের বিষয়ে বড় দুই দলের মানসিকতা প্রায় কাছাকাছি। তবে, আওয়ামী লীগ পারছে শক্ত হাতে। বিএনপির তদ্দূর কুলাচ্ছে না। বাস্তবিক এ অবস্থায় বামপাড়ার দলগুলোর মধ্যেও নতুন কিছু হিসাব-নিকাশ চলছে। বাম গণতান্ত্রিক জোট মনে করে, দেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান শূন্যতা তৈরি করতে যার সঙ্গেই হোক মাঠে তৎপর থাকতে হবে। তাই প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও জোটের তুলনায় শক্তি–সামর্থ্যে ঢের দুর্বল হলেও বাম জোট বা জোটের শরিক দলগুলো করোনার মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত থেকে অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। জোটের নেতারা মনে করছেন, দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির দাপট বৃদ্ধিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলেরই সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিএনপির তুলনায় এ ক্ষেত্রে সম্পৃক্তা বেশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। তারা কৌশলে জামাত-হেফাজতকে হ্যান্ডেল করছে। আবার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাহবা নিচ্ছে। বিএনপি সেই ক্ষেত্রে শিশু। উল্লেখ্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠিত হয়। শুরুতে জোটে আটটি দল ছিল। দলগুলো হলো সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লিগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। গত বছর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে একটা অংশ বেরিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্ক্সবাদী) নামে নতুন দল করে। এই দলটিও বাম জোটে যুক্ত হয়। জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কেবল তিনটির—সিপিবি, বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে।
১৯৯৬ সালের পর এই জোটের শরিক কোনো দল থেকে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। ১৯৯১ সালে সিপিবির পাঁচজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। সিপিবিসহ তাদের কেউ কেউ সরকারমুখী। আবার কয়েকটির ওঠাবসা বিএনপির সঙ্গে। তবে, কৌশলে এগিয়ে আওয়ামী লীগ। দিয়ে না দিয়ে, মেরেধরে ১৪ দলের ব্যানারে তারা মোজাফফরের ন্যাপ, ইনুর জাসদসহ বাম মহল্লার বেশির ভাগ দলকে আয়ত্বে রাখছে সাফল্যের সঙ্গে। ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে টানা তিনবার ক্ষমতায়। এর মধ্যে প্রথম দুই দফায় মন্ত্রিসভায় জায়গা পান শরিকদের কেউ কেউ। ২০১৯ সালে তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের বাইরে শরিক দলের কেউ ঠাঁই পাননি। রাজনীতির মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় আওয়ামী লীগের কাছে শরিকদের অবস্থান দুর্বল হয়ে গেলেও গুডবাই দিয়ে সরে পড়ার রাস্তা নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪–দলীয় জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমুকে জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ভার্চুয়ালে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে মাত্র। এই ভার্চুয়ালেই তাদের অ্যাকচুয়াল স্বাদ নেয়া ছাড়া আপাতত বিকল্প নেই। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এসবের বিহিত করতে না পারলে সামনে আরো কোন ধরনের অঘটনের শঙ্কা তাদের। তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আনছেন আগস্ট ট্র্যাজেডির আগের নমুনার কথা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিলেও কিছু অস্ত্র বাইরে থেকে যায়। ওইসব অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি, লুটতরাজ, ছিনতাই, বাড়িঘর দখলের মতো নৈরাজ্য চলেছে। থানা পর্যন্ত লুট হয়েছে। ব্যাংক লুটও হয়েছে। পাটের গুদামে আগুন দেয়া হয়েছে সমানে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনীও নামিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এতে একে একে দলীয় লোকজনই বেশি ধরা পড়তে থাকে। যা দলের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করে। পরিস্থিতির অনিবার্যতায় এক পর্যায়ে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে গঠিত হয় বাকশাল। তা হিতে বিপরীত ডেকে আনে। হাল বাস্তবতায় সে ধরনের শঙ্কা নেই। এরপরও পঁচাত্তরপূর্ব পরিস্থিতির ইঙিত তাদের কাছে এখন পর্যন্ত দুর্বোধ্য এবং প্রশ্নবিদ্ধ।
মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বাংলাপোষ্ট
Posted ৭:১৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।