নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 892 বার পঠিত
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আড়াই মাস পর পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর জেলখানায় তার সহচর ৪ নেতাকে হত্যা কি কেবলই হত্যার জন্য হত্যা? নাকি এর আগে-পিছে আরো বিষয়াদি আছে? ঘটনার হোতা কি ১৫ আগস্টের হত্যাকারীরাই? নাকি সঙ্গে আরো কেউ যোগ-বিয়োগ হয়েছে? –এসব প্রশ্নের দিকে আলোকপাত এখনো তেমন নেই?
মোটাদাগের তথ্য হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর কারাভ্যন্তরে খুন করা হয় জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে। জেল হত্যা দিবস নামে প্রবিছর পালন হয় দিনটি। ৪ নেতাকে গভীর রাতে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে-এর একটা আবেগঘন বর্ণনা দেয়া হয়। কিন্তু, উপরোক্ত প্রশ্নগুলো আসে না। এলেও দুয়েকদিন পর হারিয়ে যায়। চলে আসছে এভাবেই।
তখন তো সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের নানা কাণ্ডকীর্তি। এর মাঝেই কারাগারের ভেতর অবিশ্বাস্য এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড। খবরটি চার নেতার পরিবার সেদিন জানতে পারেননি। পরদিন ৪ নভেম্বর পুরনো ঢাকার এক বাসিন্দা তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় এসে জানান যে তিনি আগের দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলির শব্দ শুনেছেন।
প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি ২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে বলেন, ৪ নভেম্বর বিকাল চারটার দিকে খবর আসতে শুরু করলো তাজউদ্দীন আহমদসহ চারজন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এও বলেছিলেন, তখন সেনাবাহিনীতে নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের পরিণতি ছিল জেলখানার হত্যাকাণ্ড। ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের বিপরীতে পাল্টা আরেকটি অভ্যুত্থান হয়েছিল তেশরা নভেম্বর। সেটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ।
আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয়জন জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা তখন বঙ্গভবনে বসে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাককে পরিচালনা করছিলেন। তাদেরকে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমাণ্ডের আওতায় আনার জন্য তেশরা নভেম্বর খালেদ মোশারফের নেতৃত্ব অভ্যুত্থান হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর বইতে। তাছাড়া শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডকেও তাঁরা মেনে নিতে পারছিলেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন। খালেদ মোশারফের অনুগত সৈন্যরা জেনারেল জিয়াকেও বন্দি করেছিল। সেটার রেশ ৭ নভেম্বর। এসব বর্ণনায় ৩রা নভেম্বর আবার তলিয়ে যায়, সামনে চলে আসে ৭ নভেম্বর।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে মেজর পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন বর্তমানে বিগ্রেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
কিছু ঘটনা তখন বেশ কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তার লেখা ‘বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায়: ১৯৭৫-৮১’ শিরোনামে বইটিতে এর কিছু আলোকপাত আছে। …. বঙ্গভবনের থাকা সেনা কর্মকর্তাদের সাথে একটা সংঘাত চলছিল সেনানিবাসের উর্ধ্বতন কিছু সেনা কর্মকর্তাদের সাথে। …খন্দকার মোশতাক যে বেশিদিন ওখানে টিকবেন না, এটাও ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে একটা ধারণা জন্মেছিল। …শেখ মুজিবকে হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা ধারনা করেছিলেন যে কোন পাল্টা অভ্যুত্থান হলে সেটি আওয়ামী লীগের সমর্থন পাবে। সে ধরনের পরিস্থিতি হলে কী করতে হবে সে বিষয়ে মুজিব হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা কিছুটা ভেবেও রেখেছিলেন।
বিগ্রেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের এসব বর্ণনার মাঝে এমন কিছু প্রশ্ন এসে যায় যার নিস্পত্তি করা আরেক কঠিন ব্যাপার। খুনিদের চেহারাসহ ঘটনাও পাল্টে যায়। রাজনীতি বিশ্লেষক এবং গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন জেল হত্যাকাণ্ডের সাথে ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কিত। কারণ মুজিব হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে সে অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগ বা বাকশালের পক্ষে হচ্ছে। কিন্তু খালেদ মোশাররফ এবং তার সমর্থকদের কার্যকলাপ থেকে এ ধরনের কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। তখনকার ক্ষমতাসীন মোশতাক বা তার সমর্থকরা চাননি যে তাদের বিরোধী আরেকটি শক্তি শাসন ক্ষমতায় পুনর্বহাল হোক। ঐ ধরনের একটা সরকার হলে জেলে থাকা সেই চারজনই ছিলেন সম্ভাব্য নেতা। আবার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে হওয়া অভ্যুত্থানের সাথে আওয়ামী লীগের কোন সম্পর্ক বা সমর্থনের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। এতে আবার অন্য ম্যাসেজ মেলে। যার কুলকিনারা ভেদ করা কঠিনের চেয়েও কঠিন। সেই কঠিনের মাঝেই সত্য হচ্ছে, বিশ্ব ভ্রমান্ডে বিংশ শতকের নোংরা ঘটনা কারাগারে গিয়ে ৪জন নেতাকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে খুনিদের শিনা টান করে জেল থেকে বের হয়ে আসা।
বঙ্গবন্ধু যাঁদের হাতে নিহত হয়েছিলেন তাঁদের সবাই তাঁর আস্থাভাজন ছিলেন। তাঁর অবর্তমানে একাত্তরে তারাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বেশি নির্ভরশীল ও বিশ্বস্ত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, কামরুজ্জামানরা। ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল, যে সময় সৃষ্টি হয়েছিল এ দেশের ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালো অধ্যায়। যদিও জেনারেল জিয়াকে মোশতাক সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন বাস্তবে তখন সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ চেন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল। ঘাতক ফারুক-রশিদ গং এই পুরো সময়টা বঙ্গভবনে অবস্থান করছিল এবং মোশতাককে তাদের কথামতো চলতে বাধ্য করছিল। সেনাবাহিনীতে চেন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ আরো কয়েকজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা চেষ্টা করেন। কিন্তু, পেরেও পারেননি। নিজেরাও জড়িয়ে গেছেন নানা দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসে। সেই ধোঁয়াশার মাঝেই ৩রা নভেম্বর। নির্মোহ গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ হলে এর রহস্য উদ্ধার ও খুনিদের জানা অবশ্যই সম্ভব।
মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাপোষ্ট
Posted ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।