মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার | মঙ্গলবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 884 বার পঠিত
’সিপাহি- জনতা ভাই ভাই‘-এর সেই বোধ-চেতনা থাকুক আর না থাকুক আজ ৭ই নভেম্বর। যেমন ফুল ফুটুক আর না ফটুক বসন্ত তার যথানিয়মে চলে আসে। প্রকৃতিকে বিলিয়ে দেয় তার রূপ-সৌন্দর্য। স্বাধীন বাংলাদেশে ৭ই নভেম্বরও তাই। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর ক্যু-পাল্টা ক্যুর মাঝে দেশের রাজনীতির গতি বদলের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ৭ নভেম্বর। দিনটির ঘটনাপ্রবাহকে মূলত স্বাধীনতাযুদ্ধের দুই অমিত সাহসী সেনানী জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ ঘটনার শুরুর মূল নায়ক ছিলেন খালেদ মোশাররফ। রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর দুটাই কালো অধ্যায়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা, ৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর ও জাতীয় চার নেতাকে জেলের মধ্যে বর্বরভাবে হত্যার পরও রক্তধারা থামেনি। ৭ নভেম্বর সেই ধারায় ফুল স্টপ না হলেও একটি যতিচিহ্ন আসে জিয়াউর রহমানের সময়োচিত হস্তক্ষেপে।
১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর ব্যর্থ সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূতের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। ক্ষমতার মোহে সেনাপ্রধান হতে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থান ঘটান খালেদ মোশাররফ। সেখানেও রহস্য। খন্দকার মোশতাককে উৎখাতের বদলে তিনি মোশতাকেরই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেনাপ্রধান হওয়ার বৈধতা নিতে চান। আর ১৫ আগস্টের খুনিদের থাইল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।৩ নভেম্বর ঘটনায় দেশে ৪ দিন কোন সরকার ছিল না। মোশতাক বঙ্গভবনে খালেদ মোশাররফ বাহিনীর কব্জায়। খালেদ মোশাররফই সেনা প্রধান। দেশেরও প্রধান। জিয়া তখন গৃহবন্দী। তার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ গড়েন তৎকালীন জাসদ নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর তাহেরের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসকে কাজে লাগান জিয়া। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যার পর থেকেই বিশৃঙ্খলা শুরু হয় সেনানিবাসে। ঝরে রক্ত। বিপ্লবী সৈন্য সংস্থার কিছু বিভ্রান্ত সৈন্য এবং পাকিস্তানফেরত উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যদের হাতে সেই রাতে একজন নারী চিকিৎসকসহ ১৩ জন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এমনকি সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রীকেও হত্যা করে তারা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো বেপরোয়া স্লোগানে মেতে ওঠে বিভ্রান্ত সৈনিকরা। এর ফাঁকে মধ্যরাতে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে বের করে ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে যায় তারা। জিয়া তাদের শান্ত করেন। হত্যাযজ্ঞ থামানোর শর্ত দেন। দাবিদাওয়া পূরনের আশ্বাস দেন।
দিনটিকে জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবস হিসেবে পালন করে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি। প্রতিপক্ষের এ নিয়ে ব্যাপক আপত্তি। তাদের মতে, এটি জাতির সঙ্গে একটি নির্মম তামাশা। তারা বলতে চান, এটি মানবতাবিরোধী পদক্ষেপ। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাঅধিনায়কদের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারের পথ রুদ্ধ করতেই দিনটিকে সংহতি ও বিপ্লব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানই কিছু উচ্ছৃঙ্খল সৈনিককে উস্কানি দিয়ে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছেন বলে দাবি তাদের। ঘটনা এতো সরলরৈখিক ছিল কিনা, এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে।
৭ নভেম্বর ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলি কেবলই জিয়া ও তাহেরের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের লড়াই ছিল না। জাসদ অভিযোগ করে, জিয়াউর রহমান কথা রাখেননি। বরং নির্মমভাবে জাসদকে দমন করেছেন। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ক্ষমতাকে আরও পোক্ত করেছেন। এর বিপরীত মত হচ্ছে, কর্নেল তাহের জিয়াকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। জাসদকে ঘিরে কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ আগে থেকেই পাওয়া যায়। কিন্তু কর্নেল তাহের বা জাসদ এককভাবে ক্ষমতা দখলে সক্ষম ছিল কি না, জাসদের প্রতি জনসমর্থন ছিল কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে বেতারে ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার কারণে জিয়ার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভর করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছিল জাসদ ও কর্নেল তাহের। এ রকম যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড ও নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই জিয়া ক্ষমতায় চলে আসেন। বিএনপি বা জিয়ার অনুসারীরা মনে করেন, সিপাহি জনতার সম্মিলিত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়া ক্ষমতার মঞ্চে উপবিষ্ট হন। সময়টা ছিল তার জন্য আশীর্বাদের। ওই সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও বিশৃঙ্খলার জন্য জনসাধারণ ক্ষুব্ধ ছিলেন।
সদ্য স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মধ্যে অতৃপ্তি ছিল। বেকারত্ব, বাজারে খাদ্যপণ্যের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নানা ধরনের গুজব, দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্যের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হ্রাস পেতে থাকে। ওই সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সেনাবাহিনী শাসনক্ষমতা দখল করেছিল। আরব, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে সামরিক শাসকেরা ক্ষমতায় চলে আসেন। জিয়াউর রহমানও ৭ নভেম্বরের ঘটনা পরিক্রমায় ক্ষমতায় চলে আসেন। কিন্তু, তিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করেননি। বিচক্ষণতার সাথে বাংলাদেশে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। সেইসঙ্গে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এর আগে অবশ্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের উল্লেখ মাওলানা ভাসানী ও আবুল মনসুর আহমদের বক্তৃতা ও লেখায় পাওয়া যায়। তবে ওই সব লেখা বা বক্তব্যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা পরিস্কার ছিল না। জিয়া সেটা পরিস্কার করেন তার কাজের মাধ্যমে। সেইসঙ্গে নতুন নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে চলে যেতে থাকেন গণমানুষের কাছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়ে আসেন অর্থনীতিকে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান উপসামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অবস্থাতেও জিয়া এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় কাটিয়ে দেশকে পুনরুজ্জীবিত করার এক বিশাল গুরুভার কাধে নেন। মিশ্র অর্থনীতিতে দেশের ব্যক্তি ও সরকারি উভয় খাতকেই তিনি গতিশীল করে তোলেন খুব দ্রুত। দেশের আনাচে- কানাচে লিফলেট আকারে বিমান থেকে ফেলে জিয়ার উন্নয়ন দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার অনুসন্ধানে তিনি মাইলের পর মাইল গ্রাম্য মেঠোপথ হেঁটে বেড়িয়েছেন। এর রাজনৈতিক সুফলভোগী হন তিনি নিজে। চাঙ্গা হয় দেশ। ৭৩-৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ৭৭-৭৮ এ অনেকটা ম্যাজিকের মতো মাস কয়েকে সারিয়ে তোলেন তিনি। সেই কৃতিত্ব তাকে সেনানায়ক থেকে নিয়ে আসে রাজনীতির নায়ক তথা রাষ্ট্রনায়কে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলেই বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের হাঁটি হাঁটি পা করে যাত্রা শুরু, যা আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। দেশীয় পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়, বিদেশি পণ্য আমদানি ও রফতানি সব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর আরোপ্ও তার আমলে। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে করারোপ তদন্ত কমিশন কর্তৃক সরকারিভাবে বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে মূসক চালু করা হয়। যুবসমাজকে সুসংগঠিত এবং উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তর ও জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় অবদান রাখার জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হিসেবে পুনঃনামকরণ করা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে জনশক্তি রফতানির ব্যবস্থা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ৭ই নভেম্বরের বাঁক বদলেই বাংলাদেশের মিশ্র অর্থনীতি ও বহুদলীয় রাজনীতির এসব রসায়ন।
মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাপোষ্ট
Posted ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।