| শুক্রবার, ২১ এপ্রিল ২০২৩ | প্রিন্ট | 132 বার পঠিত
মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
একদিকে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় রোদসহ আবহাওয়ার অগ্নিমূর্তি। দেশজুড়ে ভয়ংকর তাপদাহ। রোজার মাঝেই ঢাকায় ৭২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। পশুকূল-প্রাণিকূল নাকাল। জ্ঞানভরা ভাব নিয়ে আমরা একে বলি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’। প্রকৃতির অস্বাভাবিকতা। প্রকৃতি এমনি-এমনি বা মনের সুখে অস্বাভাবিক হয়? কে তাকে চেঞ্জ করে বা ক্ষেপায়?
এ প্রশ্নের মাঝেই ঘুরছে আগনের কুণ্ডলি। তা বেশি রাজধানীতে। আজ এখানে, কাল সেখানে আগুন লাগছে। মহাখালীর সাততলা বস্তি, কাপ্তানবাজারের সুইপার কলোনি থেকে বঙ্গবাজার, নবাবপুর, নিউমার্কেট হয়ে বায়তুল মোকাররম, উত্তরা বিজিবি মার্কেট, ওয়ারি কোথাও বাদ নেই। ঢাকার পাশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও চট্টগ্রাম এমন কি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটছে আগুনের।
আগুন নিজে লাগে, না কেউ লাগিয়ে দেয়- এ নিয়ে বহুকথা আছে। কিছুদিন ধরে আগুন কি এত শক্তিশালী হয়ে গেছে, নিজে নিজেই লেগে যাচ্ছে? আবিষ্কারের শুরুতেও আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলেনি। ঘষা লেগে কিংবা ঘষা লাগিয়েই জ্বলে উঠতে হয়েছে আগুনকে। একের পর এক আগুনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এসব কথাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
মাস কয়েক ধরে ‘খেলা হবে, খেলা হবে’ নামে একটি নিম্নমানের রাজনৈতিক স্লোগান চলেছে। রাজনীতির মাঠে উত্তাপ থাকলেও ঘোষণা বা স্লোগান মতো কোনো খেলা স্পষ্ট নয়। তবে, কথার খেলা ক’দিন আচ্ছা মতো চলছে। যে যাকে যা পারছেন ইচ্ছা মতো চলছে। এর মাঝেই ভর করেছে আগুন খেলা। আগুনের খবর প্রায় প্রতিদিনই । হয় নতুন আগুন, নয় পুরনো আগুনের ফলো আপ।
ক্ষমতাসীন মহল থেকে প্রথমে ইঙ্গিত, পরে নাম ধরেই এ আগুনের জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হচ্ছে। সরকারের শীর্ষমহল থেকে বলা হয়েছে, আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি এখন আগুন লাগানো শুরু করেছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে। বিএনপিরও সরাসরি আক্রমণ সরকারের দিকে। বঙ্গবাজার-নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গার নতুন করে দখল ও বরাদ্দের জন্য এ আগুন খেলা চলছে বলে তাদের অভিযোগ। দক্ষিণের মেয়র তাপস অনেকটা টার্গেট পয়েন্টে। বঙ্গবাজার-নিউমার্কেটের আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তাকেই দূষেছেন। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে তা বেরিয়ে আসবে বলে দাবি তাদের।
অবিরাম এসব অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নাশকতা-ষড়যন্ত্র আছে কি না, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন আগুন কেন শেষ রাতে? বস্তিতে লাগা আগুন যে সব সময় দুর্ঘটনা নয়, তা বহুবার প্রমাণিত। বলা হয়ে থাকে, বস্তিতে আগুন লাগে না, লাগানো হয়। এখন মার্কেটের আগুন নিয়ে প্রশ্ন। এ আগুন কোন জাতের? রমজানে ঈদের কেনাকাটার ভরা মৌসুমে এ আগুন খেলার প্রশ্নটা নানা মহল থেকেই। বিশেষ করে রাজধানীর বঙ্গবাজারে সর্বনাশা আগুনের ধোঁয়া থাকতে থাকতেই এর নিকটবর্তী বরিশাল প্লাজা, মালেকা মার্কেটে আগুন। এর দিন কয়েকের মধ্যেই আগুনের কুণ্ডলি নবাবপুরে সুরিটোলার গুদামঘরে। পুড়ে ছাই হয়ে যায় সুরিটোলার গুদামে রাখা প্রায় অর্ধশত দোকানের বেশিরভাগ পণ্য। এরপর নিউমার্কেট, উত্তরা বিজিবি মার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গায়।
সামনে নির্বাচন। ওই নির্বাচনের আগে এটিই শেষ রমজান। হয়তো এ কারণে এবারের রমজানে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত-সংঘর্ষের খবর তুলনামূলক বেশি। বাজারে নিত্যপণ্যের দামে আগুন বেশি। সেই সাথে বাস্তব আগুনও। তা ঘরপোড়ার মাঝে আলুপোড়া খাওয়ার কোনো আগুনখেলা কি না, প্রশ্ন অনেকের। আগুনের একেকটি ঘটনা থ বানিয়ে দিচ্ছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড অনেকটা প্রাত্যহিক কাণ্ড। আসসমান থেকে শয়তান বা ফেরেশতা এসে তা ঘটায়নি। এদের কাছে বঙ্গবাজার, শেয়ারবাজার, নিউমার্কেট আর বস্তি-কলোনির তফাত থাকে না। এরা দেবালয়-লোকালয় বাছবিচার করে না। ঢাকার বঙ্গবাজার, মহাখালীর সাততলা বস্তি, কাপ্তানবাজার মুরগিপট্টি, সুইপার কলোনি থেকে ভোলার ওয়েস্টার্ন পাড়ার তুলার গুদাম, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা বা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প তাদের কাছে একই।
এসব অগ্নিকাণ্ডকে মোটেই সাদা চোখে দেখার অবস্থা নেই। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও এ সংক্রান্ত ঘটনার নেপথ্য তথ্য তেমন নেই। গত মাস কয়েকে বিভিন্ন জায়গার কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের পেছনে সে ধরনের পরিকল্পনার সন্দেহ করা হলেও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ মিলছে না। তবে সন্দেহ ব্যাপক। গত বছরের ২৪ হাজার ১০২টি অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যও সেভাবে উদ্ধার হয়নি। ওইসব অগ্নিকাণ্ডে ৩৪২ কোটি ৫৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৮৯ টাকার ক্ষতি, ফায়ার সার্ভিসের ১৩ জন ছাড়াও ৮৫ জনের মৃত্যুর তথ্য। কারণ হিসেবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কথা। কয়েকটি দুর্ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। যে কটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, সেখানে বিস্ফোরণের জন্য প্রধানত দায়ী করা হয়েছে ভবন বা প্রতিষ্ঠানের মালিককে। এর আগে ২০২১ সালের জুনে রাজধানীর মগবাজারে বিস্ফোরণের জন্যও দায়ী করা হয়েছিল তিনতলা ভবনের নিচতলায় জমে থাকা গ্যাসকে। অথচ ওই ঘটনায় ভবনের নিচতলায় কোনো গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি, গ্যাস সিলিন্ডারও অক্ষত ছিল। সে সময় বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, তারা সেখানে মিথেন গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন, যা পয়ঃনিষ্কাশন লাইন থেকে লিক হতে পারে। এর আগের বছর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি মসজিদে বিস্ফোরণে ৩৪ জনের মৃত্যুর ঘটনার পোস্টমর্টেমও ছিল এমনই।
ঢাকার সায়েন্সল্যাব এলাকায় প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের পাশের তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত, অর্ধশত আহতের ঘটনাও দাগ কেটে আছে মানুষের মনে। বিশেষ করে যার ঘা তার ব্যথার মতো ধুকছে হতাহতদের পরিবারগুলো।
যে কোনো ঘটনাকে দুর্ঘটনা বা দুর্ঘটনাকে নাশকতা বলা কাম্য নয়। এসব নিয়ে রাজনৈতিক কথার পাণ্ডিত্য নাশকতার চেয়েও কম নয়। বিগত কয়েক বছরে আগুন ও বড় ধরণের বিস্ফোরণের বেশ কিছু খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। শুরুতে নাশকতা-ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলেও পরে তা প্রমাণ হয়নি। বিস্ফরনের ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়েছে জমে থাকা গ্যাস আর ভবন বা ফ্যাক্টরি মালিকদের। গত মাস কয়েকে এমন কী ঘটলো যে গ্যাস লিকেজে বিস্ফোরণের পর এখন আগুন তেজে বা ক্ষেপে গেছে?
প্রতিটি দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন এক ধরনের রুটিন ওয়ার্ক। এ কমিটিকে রিপোর্ট দিতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়৷ অনেক সময় তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ সময় চলে যায়। নানা ঘটনার তোড়ে মানুষও ঘটনা ভুলে যায়। তদ্দিনে আরো আগুন-বিস্ফোরণ। আর কতো? কাউকে দায়ী করা বা এক ইস্যু বানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা মোটেই কাম্য নয়। আলোচিত ও বড় ঘটনা ছাড়াও প্রতিনিয়ত ছোটখাটো অসংখ্য আগুন-বিস্ফোরণ ঘটছে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভুক্তভোগীরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি শহরের কিছু এলাকা ‘বিস্ফোরণোন্মুখ’। পুরান ঢাকার অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ দিকটিও বিবেচনায় রাখার দাবি রাখে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলা পোস্ট এবং প্রকাশক, বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা।
Posted ১২:৩৪ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২১ এপ্রিল ২০২৩
banglapostbd.news | S A
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।