| রবিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৩ | প্রিন্ট | 145 বার পঠিত
অধ্যাপক ড. মুফতী মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী
আজ ১৭ রমজান। ঐতিহাসিক বদর দিবস। আজ থেকে ১৪৩৮ বছর আগে সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে মুসলিমরা বিজয়ী হয়েছিলেন। সত্যের পতাকা উড়েছিল আকাশে। এর ১৫ বছর আগে এক আল্লাহর দাওয়াত নিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করেন নবীয়ে রহমত হজরত মুহাম্মদ (সা.)। শান্তিপূর্ণ ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম বাধা দিতে থাকে মক্কার অমুসলিমরা। নওমুসলিমদের ওপর চালাতে থাকে অমানবিক নির্যাতন। ১৩ বছর নবীয়ে কারীম (সা.) সব সহ্য করে নিরাপদ দূরত্বে মদিনায় আশ্রয় নিলেন। মদিনার সবল অধিবাসীদের নিয়ে মদিনা রাষ্ট্র গঠন করলেন। মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন সহ্য করতে পারল না মক্কার কাফেররা। তারা ইসলামের জনপ্রিয়তা, বিস্তৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা দেখে ইসলামের চরম শত্রুতায় অবতীর্ণ হলো। তারা ঘোষণা করল আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যে ব্যবসায়ী কাফেলা সিরিয়া যাচ্ছে তা ফেরত আসার পরই আক্রমণ চালাবে মদিনার ওপর। এ জন্য যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ব্যবসায়ী কাফেলার লভ্যাংশের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করা হবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে।
এ সংবাদ মদিনায় পৌঁছার পর রাসুলে আরাবি (সা.) আবু সুফিয়ানের ব্যাবসায়িক কাফেলাকে নজরদারিতে রাখলেন। একপর্যায়ে আবু সুফিয়ান নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত বলে মক্কায় সাহায্যের জন্য খবর পাঠায়। মক্কার কুরাইশরা আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। আবু সুফিয়ানের আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে তারা যুদ্ধের জন্য মদিনা মুখে অগ্রসর হতে লাগল। মুসলিমরা আবু সুফিয়ানের ওপর কোনো আক্রমণ করেনি। তারা কাফেলাসহ নিরাপদে চলে যায় মক্কায়।
এ দিকে মক্কার কুরাইশেদের নেতৃত্বে আসা যুদ্ধ বাহিনী মদিনা থেকে ৮০ মাইল বা ১৩০ কিমি. দূরত্বে বদর প্রান্তরে সুবিধাজনক স্থানে তাবু স্থাপন করে। আবু জাহলের নেতৃত্বে কুরাইশ বাহিনী পুনরায় মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার ঘোষণা জানায়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে মুসলিমরা সেখান থেকে সরে যাবে তারও উপায় ছিল না। মুসলমানরা বালুকাময় স্থানে রাত্রিযাপন করল।
১৭ রমজান রাতেই সম্মুখ যুদ্ধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.), যিনি মুসলমানদের প্রতি সদয়, কাফেরদের প্রতি কঠোর, তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। সিজদায় অবনত হয়ে বলতে লাগলেন, এ মুষ্টিমেয় মুসলিম যারা আজ তোমার নাম জপে, তোমার ওপর ঈমান এনেছে, আজ যদি তাদেরকে ধ্বংস করে দাও তাহলে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন।
আল্লাহ সাহায্য করলেন। বিজয়ের ওয়াদা করলেন। রাতেই রহমতের বৃষ্টিতে মুসলিম স্থলে বালু জমে চলাচল উপযোগী হয়ে গেল। অমুসলিমদের স্থল কর্দমাক্ত হয়ে গেল। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা নাজিল হলো। আল্লাহর সাহায্য যেখানে আছে সেখানে বিজয় আসবেই। এ জন্য নিজের জীবন দেওয়ার প্রয়োজন হলে সেখানে নিজেদেরকে উৎসর্গিত করতে হবে।
১৭ রমজান সকালে কাফেররা মল্ল যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাল। তিনজন কাফেরদের বিরুদ্ধে তিনজন আনসারি সাহাবি এগিয়ে গেলেন। কাফেররা উদ্বৃত, উন্নাসিক আচরণ করে আহ্বান জানাল মুহাজিরদের পাঠানোর জন্য। হজরত আমির হামযা (রা.), আলী (রা.) ও উবাইদা (রা.) এগিয়ে গেলেন। প্রথম ধাপে তিনজন কাফেরই পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করল। পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হলে সাহাবায়ে কেরাম জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে শরিক হলেন। উমায়ের ইবনুল হুমাম আনসারি প্রথম শহীদ হলেন বদর প্রান্তরে। একে একে সাদ (রা.), উবাইদা (রা.), আকিল (রা.), আউফ (রা.), হারিছ (রা.), মুয়াওয়িজ (রা.) ও আম্মার (রা.)সহ মোট আটজন মুহাজির, ছয়জন আনসারি শহীদ হলেন। তাদের জীবনের বিনিময়ে ইসলামের প্রথম বড় বিজয় এলো। এ বিজয়ের অভিযানে মাত্র ৩১৩ জন নিরস্ত্র সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে এক হাজার সশস্ত্র কুরাইশ যোদ্ধা অংশ নিয়েছিল মুসলিমদেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। এ যুদ্ধে মুসলিমরা ধ্বংস হলেন না। ধ্বংস হলো কাফির শক্তির আবু জাহেল উতবা শায়বাসহ ৭০ জন নেতৃস্থানীয় অমুসলিম। বন্দি হলো আরও ৭০ জন।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদেরকে শেখালেন অস্ত্র আর সৈন্যবাহিনীর আধিক্যের কারণে বিজয় আসে না; বিজয় আসে পরিপূর্ণভাবে রবের কাছে নিজেদেরকে সঁপে দেওয়ার মাধ্যমে। বিজয় আসে পিছুটানহীন জীবন উৎসর্গকারী কিছু মুসলিমদের কারণে। বদরের এ বিজয় মুসলিমদের কারণে। বদরের এ বিজয় মুসলিমদের সুযোগ করে দিয়েছিল আরও মাথা তুলে চলার জন্য। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে সারা বিশ্বের মালিকের কাছেই মাথা নত করার শিক্ষা দিয়ে যায় বদর। প্রতি রমজানের ১৭ তারিখে মনে করিয়ে দেয় তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা সত্যের ওপর অটল থাক। এ রমজান বিজয়ের বার্তা দিয়ে যায়। এ বার্তা সফল হয়েছিল বদরে, এ বার্তা সফল হয়েছিল মক্কা বিজয়ে। এখনও বিজয় আসবে প্রকৃত মসুলিমদের আত্মত্যাগে।
লেখক : অধ্যাপক, উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Posted ২:১২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৩
banglapostbd.news | S A
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।