| বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩ | প্রিন্ট | 131 বার পঠিত
দিলীপ রায়
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা হচ্ছে সরকারি সেবা প্রদান বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের মাধ্যমে নাগরিকের অসন্তুষ্টি ও সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করার একটি মাধ্যম। এর দ্বারা মূলত দ্রুত ও সহজে সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবাদাতাদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি, কম সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে ও ভোগান্তি ছাড়া সেবা প্রদান এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বপ্রণোদিতভাবে সেবা প্রদানে এগিয়ে আসার মনোবৃত্তি বিকাশ। গণিতের ভাষায় যেটিকে বলা হয় যোগাশ্রয়ী প্রোগ্রাম।
এ ছাড়াও জনগণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ায় উদ্ভূত অভিযোগ, অনুযোগ, বিবাদ ও দ্বন্দ্ব সমাধানে নিয়মাবলি, পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে এ ব্যবস্থায়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’
সেবার মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন জনসেবা প্রদানকারী দফতরগুলোর কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা। এই উদ্দেশ্যে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআএস) একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারি দফতরগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং সুশাসন সংহতকরণের মাধ্যমে ভোগান্তিবিহীন জনসেবা নিশ্চিতকরণই অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
বিভিন্ন সরকারি দফতরে সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নাগরিকদের অসন্তুষ্টি বা সংক্ষুব্ধতা থাকতে পারে, নাগরিকরা যেন এই ক্ষোভ নিবারণের জন্য প্রতিকার চাইতে পারেন তার জন্যই মূলত এই ব্যবস্থা।
সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০১৪-এর অষ্টম অধ্যায়ে ২৬২ (১) ও (২) সংখ্যক নির্দেশে নাগরিকদের মতামত গ্রহণ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে অভিযোগগুলোর প্রতিকার প্রদানের অনুশাসন দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সেবা প্রদানে সরকারি কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে জনসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পিফরডি প্রকল্প মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পিএসএ ভিডিও তৈরি করেছে। এর দ্বারা মানুষ বুঝতে পেরেছে যে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা কী, কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং কেন ব্যবহার করা প্রয়োজন।
প্রতিটি সরকারি দফতরে সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ বা প্রতিকারের জন্য একজন অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা থাকেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রথমে সংশ্লিষ্ট দফতরে অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা বরাবর ডাকযোগে অথবা ফ্রন্ট ডেস্কে অথবা অনলাইনে দাখিল করতে হয়। অভিযোগ সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- নাগরিক অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ।
অভিযোগ দাখিলের জন্য নির্ধারিত ফরম রয়েছে। ওই ফরমে সঠিকভাবে অভিযোগ দাখিল কিংবা প্রয়োজনে আপিলও করা যাবে।
নাগরিকগণ চাইলে নিজের পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। ফলে কারও ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে না। অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকগণ সিটিজেন চার্টারে উল্লিখিত সরকারি সেবা-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা দাখিল করতে পারেন। অভিযোগপ্রাপ্তির পর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে থাকেন। প্রতিটি অভিযোগ নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অথবা ডাকযোগে বা বাহকের মাধ্যমে ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে অভিযোগকারীকে অভিযোগের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করার বিধান রয়েছে।
তবে কোনো অভিযোগকারী অসত্য বা কাউকে হয়রানি করার কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে অভিযোগ দাখিল করলে অভিযোগ নিষ্পত্তিকারী কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।
বর্তমান সরকারের ভিশন অনুযায়ী দুর্নীতি দূরীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবস্থাগত উন্নয়ন ও প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সব সংস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো সহজ কাজকে দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে আটকে রাখার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে নাগরিকদেরও উচিত কোনোরূপ দুর্নীতির আশ্রয় না নেওয়া।
জনসাধারণকে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে তদসংশ্লিষ্ট ছবি, তথ্যচিত্র এবং ভিডিওর মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এর ফলে মানুষ অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা ও নিজ এলাকার উন্নয়নে এর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হলে দুর্নীতি রোধ করতে হবে। দুর্নীতির তথ্য পেলে দুদকের অভিযোগ কেন্দ্রের ১০৬ নম্বরে কল করার সুযোগ রয়েছে। এভাবেই সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যকারিতা পাবে, এটি প্রত্যাশা।
লেখক (সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট)
Posted ১:২৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩
banglapostbd.news | S A
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।