| রবিবার, ১২ মার্চ ২০২৩ | প্রিন্ট | 176 বার পঠিত
আব্দুল বায়েস: প্রফেসর রেহমান সোবহান এমন এক পূর্ণ ও ঘটনাবহুল জীবন প্রত্যক্ষ করেছেন, যা রীতিমতো ঐতিহাসিক। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অভ্যুদয় তার অন্তর্ভুক্ত। আবার পরিমিত ক্ষমতায় কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে তাঁর অংশগ্রহণ সেগুলো কাছ থেকে দেখে প্রতিফলিত করার সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে তিনি ইতিহাস লিখতে আগ্রহী ছিলেন না, অশীতিপর এবং অদম্য এই অধ্যাপক তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থে লিখেছেন গল্প। এটা ঠিক যে, আত্মজীবনীতে কিংবা ইতিহাস হিসেবে অন্যরাও এসব ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে তাঁর উদ্দেশ্য ইতিহাস লেখা নয়; ঐতিহাসিক বর্ণনার বাইরে গিয়ে নিজের গল্প উপস্থাপন করা। তাঁর গল্প একজন সাধারণ মানুষের উপাখ্যান, যাঁর কাছে জীবন পথচলার শুরুতে যেখানে ছিল, সেখান থেকে রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন দেশ প্রতিষ্ঠা করা অনেকটাই অলীক ছিল।
দুই.
রেহমান সোবহানের জন্ম ১৯৩৬ সালে কলকাতার এক অভিজাত নার্সিং হোমে ব্রিটিশ ডাক্তারের হাতে। বলা যায়, সমাজের সুবিধাভোগী অংশে এবং রুপার চামচ মুখে। মা ঢাকার নবাব পরিবারের মেয়ে; আর বাবা ভারতীয় ইম্পেরিয়াল পুলিশ সার্ভিসের সদস্য, ঘটনাক্রমে স্যানডহার্স্ট একাডেমিতে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সমসাময়িক। সোবহান নিজেও পড়াশোনা করেছেন অভিজাত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে; দার্জিলিং সেন্ট পল’স স্কুল, লাহোরের এইচেসন কলেজ ও কেমব্রিজ। তাঁর জন্ম থেকে বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত এক অভাবনীয় পথচলার স্মৃতিকথা নিয়ে উপস্থিত তিনি।
একুশ বছর বয়সে যখন প্রথম ঢাকায় থাকতে এসেছিলেন তখন বাংলায় কথা বলতে পারতেন না; রবীন্দ্রসংগীত শোনেনইনি, নজরুলের কবিতায় প্রাণিত হননি, ইলিশের রসাস্বাদন ঘটেনি। মোট কথা, কেমব্রিজে তিন বছর কাটিয়ে ঢাকায় পদার্পণের সময় রেহমান সোবহান রীতিমতো বাদামি সাহেব। বিদেশে অথবা পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে অথবা বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহীর মানানসই চাকরির বদলে স্বেচ্ছায় ঢাকায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; তা আজও অপরিবর্তিত। ঢাকা তিনি ঘর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন পরিস্থিতির চাপে বা উত্তরাধিকার সূত্রে নয়; শুধু নিজেকে বাঙালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার নীতিগত সিদ্ধান্তে।
তিন.
কেমব্রিজ থেকে করাচিতে নামার আগে রেহমান সোবহানের পকেটে ছিল পেশোয়ার ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিভাগে রিডারের পদে যোগদানপত্র। প্রতি মাসে ৮০০ টাকার আকর্ষণীয় বেতনের সে প্রস্তাব বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বাবাকে বলেছিলেন– আমি ঢাকা ফিরে যাচ্ছি; ওখানে আমি আমার বাড়ি এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। রওনা হলেন নতুন জীবনের পথে। আকাশপথে নয়, স্থলপথে– করাচি, লাহোর, দিল্লি, কলকাতা। কলকাতা থেকে বিমানে ঢাকায় অবতরণ ১৯৫৭ সালের ৩ জানুয়ারি সকালে।
ঢাকায় তিনি আগন্তুক। তবে মনে পড়ল, ১৯৪৮ সালে ১২ বছর বয়সে মা ও ভাই ফারুক সোবহানের সঙ্গে এক মাসের জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। তখনকার পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী নানা খাজা নাজিমুদ্দিনের অতিথি হয়ে ময়মনসিংহ রোডের বর্ধমান হাউসে থাকতেন। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলে সেটা রূপান্তরিত হয় বাংলা একাডেমিতে। বাংলা একাডেমির পথে যেতে যেতে এখনও স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে ওঠে প্রথম তলার শয়নকক্ষ, যেখানে তাঁরা তিনজন এক মাস ছিলেন; প্রবেশদ্বার ও পুকুর আগের মতো অক্ষত। তখন কোনো ইস্কাটন, তেজগাঁও কিংবা ধানমন্ডি ছিল না– সব খোলা জায়গা।
১৯৫৭ সালে ফিরে এসে দেখেন– ঢাকা আর মফস্বল শহর নয়, রীতিমতো নগরের রূপ নিচ্ছে। জনসংখ্যা সম্ভবত পাঁচ লাখের নিচে (একাত্তরে দশ লাখ), ইস্কাটন গার্ডেন, নিউ ইস্কাটন ও ধানমন্ডি পরিকল্পিত আবাসনের পথে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরও মনে পড়ে– চার নম্বর রোডের নিজের সাদামাটা একতলা বাড়ির বারান্দায় চশমা চোখে, গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরিহিত কৃষক শ্রমিক পার্টির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আবুল হোসেন সরকার বসে আছেন। সেই কালে কিছু সময়ের জন্য থাকা একজন মন্ত্রী লাখপতিতে রূপান্তরিত হতেন না; তাঁদের পার্থিব উচ্চাশার শীর্ষবিন্দু ছিল ধানমন্ডিতে একটা প্লট। নিউমার্কেট ও জিন্নাহ অ্যাভিনিউ (এখন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) বেচাকেনার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল মাত্র।
বাসা আর পেশার খোঁজে যখন রেহমান সোবহান, সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে উঠলেন ২৯ নম্বর মিন্টো রোডে হাইকোর্টের বিচারপতি চাচা ফজলে আকবরের বাড়িতে। এটা পরে বিরোধী দলের নেতার নিবাস হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে ৩৩ বছর আগে অল্প বয়সের স্মৃতি জেগে ওঠে।
ঢাকায় থিতু হতে এক বছরের মধ্যে চারবার বাসা বদল করেন। নটর ডেম কলেজে পড়ুয়া ছোট ভাই ফারুক এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের ছেলে মনজুর থাকতেন ফ্ল্যাটে। লালি নামে এক রাঁধুনির ‘প্রতিদিন যে মানের রান্না খেতাম তেমনটি জীবনের পরবর্তী ৫৫ বছর কোথাও খাইনি।’ ব্যাচেলর জীবনকে আরও গতিশীল করার জন্য আড়াই হাজার রুপিতে কিনেছিলেন একটি সেকেন্ড হ্যান্ড স্কোডা গাড়ি– কখনও চাকা খুলে বেরিয়ে যায়, কখনও কচ্ছপের মতো চিৎপটাং এবং অবশেষে এটার মৃত্যু ঘটলে ৮ হাজার ৫০০ রুপিতে অস্টিন গাড়ি কিনতে হয়। ১৯৫৭ সালের শেষে ঢাকা ক্লাবের সদস্য হয়ে সাঁতার কাটা, স্কোয়াশ খেলা ও সামাজিকতা।
চার.
পৈতৃকসূত্রে পেয়েছিলেন চামড়ার ব্যবসা। ১৯৪৭ সালে ইম্পেরিয়াল পুলিশ সার্ভিস থেকে অবসরের পর ঝুঁকি নেওয়ার বিচক্ষণতা দেখিয়েছিলেন বাবা খোন্দকার ফজলে সোবহান। ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানে, হয়তো গোটা পাকিস্তানেই প্রথম আধুনিক ট্যানারি খোলেন। চেয়েছিলেন ছেলে কেমব্রিজে সময় কাটিয়েও চামড়ার ব্যবসায় অবিচলমতি থাকবেন। নির্দেশ দিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার ব্যাড আইসেলে গিয়ে জুতা বানানোর কৌশল যেন শিখে নেন। আদেশ শিরোধার্য করে রেহমান সোবহান এক মাস জুতা সেলাইয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে ফেরেন।
১৯৫৭ সালে বাবা করাচিবাসী এবং কেআইটির পরিচালনা করছেন। ঢাকা ট্যানারিজে তাঁর ৫১ শতাংশ শেয়ারের অধিকার এবং ব্যবসা পরিচালন সংক্রান্ত একগুচ্ছ নির্দেশনা পুত্রকে লিখে দিলেন। রেহমানের পছন্দের পেশা ছিল শিক্ষা; কিন্তু চামড়ার ব্যবসা দেখভাল করতে গিয়ে ব্যক্তিমালিকানার রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন এবং স্বীকার করছেন, ‘সে আমলের ব্যবসা জগতের সঙ্গে পরিচিতি স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি আমার যে অঙ্গীকার তার বীজ বুনে দিয়েছিল।’
পাঁচ.
ফ্যাক্টরি ছিল হাজারীবাগে–নিউমার্কেট ও পিলখানা ছাড়িয়ে সর্পিল পথে দুর্গন্ধযুক্ত ট্যানারি কলোনি। তিনি লিখছেন, ‘সেখানে আমার প্রথম সফর ছিল পাপীর নরক দর্শনের মতো। পচা চামড়া, কেমিক্যাল ও নর্দমা দিয়ে প্রবাহিত ট্যানারির ময়লা পানির গন্ধ এত বছর কেটে যাবার পর আজও স্মৃতিতে লেগে আছে, হয়তোবা নাসারন্ধ্রেও।’
একবার ডিআইটির চেয়ারম্যান গুলাম আহমেদ মাদানিকে হাজারীবাগ সফরে রাজি করানো হলো, যিনি এর আগে জায়গাটার নাম দিয়েছিলেন ‘জাহান্নাম কলোনি’। ডাক পড়ে রেহমান সোবহানের, যাতে কেমব্রিজ ইংরেজি প্রয়োগ করে মাদানিকে জাহান্নাম প্রসঙ্গ টেনে বলা যে, হাজারীবাগকে সন্তের আবাস বানানোর কাজটি মূলত ডিআইটির। এর ফল হলো উল্টো– তাঁর এই ‘ঔদ্ধত্য’ মাদানিকে অত্যন্ত কুপিত করে।
ছয়.
রেহমান সোবহানের জীবনে এলো বিরাট পরিবর্তন। ঢাকায় চামড়ার ব্যবসা, কলকাতায় পৈতৃক সম্পত্তি দেখভাল করার পাশাপাশি রাজনৈতিক জগতে পর্যটনের আকর্ষণ শেষে পেশাগতভাবে থিতু হওয়ার বাসনা জন্মায়। মূলত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এমএন হুদার পরামর্শে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ঢোকা এবং পরে বাদামি সাহেব রেহমান সোবহানের বাঙালি সংগ্রামী হওয়ার গল্পটি কম রোমাঞ্চকর নয় কিন্তু।
লেখক: প্রাক্তন উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; খণ্ডকালীন শিক্ষক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
Posted ১:৫৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১২ মার্চ ২০২৩
banglapostbd.news | S A
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।