মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার | বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 188 বার পঠিত
প্রচলিত ধারণায় দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দানকারীরা বুদ্ধিজীবী। বাস্তব অর্থ একটু ভিন্ন। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে দেয়া সংজ্ঞায় বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, সকল পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।
এই সংজ্ঞায়িত বুদ্ধিজীবীদের বিচ্ছিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে একাত্তরের গোটা ৯ মাস জুড়েই। কিন্তু, এজেন্ডা বিশেষভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মধ্য ডিসেম্বরে। পাকিস্তানী বাহিনী যখন বুঝে যায় তাদের পরাজয় আসন্ন, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও যেন বিশ্বের মুখে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, সামাজিকভাবে যেন দুর্বল-পঙ্গু থাকে। এই লক্ষ পূরনে পরিকল্পনা মতো ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ ঘর থেকে তুলে নিয়ে বিভিন্ন বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরিকল্পিত ওই গণহত্যাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বিজয়ের পূর্বাপর কয়েকদিন তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে। বুদ্ধিজীবী হত্যার স্মরণে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ডাকবিভাগ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকিটের সিরিজ বের করেছে।
১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের আগমুহূর্তে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অন্যতম দুই হোতা আলবদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। অনেক সংশয়-সন্দেহের মাঝে স্বাধীনতার চার দশক পর বুদ্ধিজীবী হত্যায় তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। একাত্তরের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে উক্ত দুজনকেই ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে।
বিচার হলেও রায় ঘোষণার সময় এজলাসে আসামির কাঠগড়া ছিল শূন্য। কারণ, তারা দেশান্তরি। স্বাধীনতার পরপরই মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান বিদেশে পালিয়ে যান। তাই পলাতক বিবেচনায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার হয়েছে। শোনা যায় বর্তমানে মুঈনুদ্দীন থাকেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে, আশরাফুজ্জামান থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে।
চরম ট্র্যাজেডি এখানেই। বিচার হয়েছে। বিচারহীনতা বলা যাবে না সত্য। কিন্তু, বিচার কার্যকরের সুযোগ হয়নি। তা বাঙালি জাতিকে চিরদিন নিদারুণ যন্ত্রণাই দিয়ে যাবে। হত্যাযজ্ঞের শিকার ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, পিপিআই- পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের চীফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের চীফ রিপোর্টার এ এন এম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীন, দৈনিক সংবাদ-এর যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, ড. মো. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজির অধ্যাপক ফজলে রাব্বী ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীর স্বজনদের বেদনার সঙ্গে জাতির বেদনা এখানে একাকার।
১৫৪ পৃষ্ঠায় ৪৫৩ অনুচ্ছেদে বিস্তৃত পূর্ণাঙ্গ রায়ে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের প্রামাণ্য বিবরণ উঠে এসেছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও দালিলিক তথ্যপ্রমাণ মূল্যায়ন হয়েছে। মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানকে বিদেশ থেকে আইনসংগতভাবে ফিরিয়ে আনা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন রায় ঘোষণাকালের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক। তা এখনো আশ্বাস হয়েই রয়েছে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, নৃশংস ওই অপরাধের জন্য তাদের মৃত্যুদণ্ড না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। বাস্তবতা ঘুরছে সেখানেই। স্বস্তির বিষয় কেবল রায় ঘোষণা তথা বিচারহীনতার কলঙ্ক মোচন। আবার রায় পেলেও বিচার কার্যকর না হওয়া কম কলঙ্কের নয়।
এ বিচার প্রক্রিয়াটির শুরু ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে। ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এরপর ২ মে আশরাফ-মুঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। তাদের পাওয়া না যাওয়ায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। তারপরও আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দীন আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতেই মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২৪ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের দুই বদর নেতার বিচার শুরু হয়। রায়ও হয়েছে। এরপর থেকে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর এলে আবার শোনানো হয় রায় কার্যকরে ঘোষনা ও আশ্বাস। তা যথারীতি এবারও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়েও সেই পুরনো কথা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলী সাবরীন বলেছেন, নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা চৌধুরী মাইনুদ্দিন এবং আশরাফকে দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বদা সচেষ্ট। তারা যেসব দেশে অবস্থান করছেন সেসব দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যোগাযোগ রাখছে, যাতে তাদের ফিরিয়ে আনা যায়। সেই সঙ্গে তাদের ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। মুখপাত্র বলেন, এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যে অধিদপ্তর বা সংস্থা কাজ করছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ায় এই বিষয়ে সকল তথ্য জানান সম্ভব হচ্ছে না। বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ১০ বছর পরও দুই আসামীকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশ্বাস শুনতে থাকা কেবল কষ্টের নয়, লজ্জারও।
বিদেশে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে ওয়ারেন্ট তো দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা তার অধীনস্থ পুলিশ সদরদপ্তর থেকে। এর কো অর্ডিয়েন্স করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার সংশ্লিষ্টরা চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আসামিদের ফেরাতে যে সেল গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলোর আরো কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা তাদের।
লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাপোষ্ট ( সাপ্তাহিক )
Posted ১১:০২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।