বাংলা পোস্ট বিডি | বৃহস্পতিবার, ২২ জুন ২০২৩ | প্রিন্ট | 164 বার পঠিত
মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার
গাছ-গাছালি,ফল-ফলাদি নিয়ে লেখাজোখাও যেন আর নিরাপদ নয়। দেশের লেখক-সাংবাদিক জগতে রসকথার মতো বলা হচ্ছিলো- রাজনীতি বা সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখলে যখন গোলমাল বাধে, মামলায় পড়তে হয়, তখন বাতাবি লেবু আর পরিবেশ-প্রকৃতি বা গরু-ছাগলের বাম্পার ফলন নিয়ে লেখালেখি করলে আর ঝুঁকি থাকবে না। সত্যি-সত্যি আমার চেনাজানা লেখক-সাংবাদিকদের অনেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে এ কাজটি করছেন। তারাও কি পারছেন নিরাপদ থাকতে? রাজধানীতে গাছ কাটা নিয়ে একটি রম্য লেখা ছেপে আচ্ছা রকমে ফেঁসে গেছে দ্য ডেইলি স্টার। যে রচনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাম নেই, মেয়র ব্যারিস্টার তাপসের নামও নেই। এরপরও উকিল নোটিশ। ১০০ কোটি টাকার মানহানি! বাপের নাম ভুলিয়ে দেয়ার অবস্থা। অন্যদিকে নিরপেক্ষ-নির্দোষ প্রকৃতিও বেদরদি হয়ে উঠছে। বৃহত্তর সিলেটে এবারও বন্যার আভাস মিলছে। ওপারের পানি ও অতিবৃষ্টির ধারা এবারও। উত্তরজনপদেও তিস্তার আতঙ্ক। খরা-বন্যা, রোদ-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসসহ নানান অতি ঘটনায় মানুষ প্রকৃতিকে গালমন্দ করছে।
প্রকৃতির স্বভাব-চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে বলে কথা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। দোষটা কি প্রকৃতির? মানবকূল কি শান্তি দিচ্ছে প্রকৃতিকে? এছাড়া মানবসৃষ্ট সভ্যতার মতো প্রকৃতিসৃষ্ট জলবায়ুও বদলায়। তবে, তা প্রকৃতির যথানিয়মে। যাকে বলা হয় প্রাকৃতিক। সেখানে মানবকূলের ক্রিয়াকর্মের জের পড়লে সেই পরিবর্তনটা হয় অস্বাভাবিক। সেই অস্বাভাবিকতা এখন দেশে-দেশে। বাংলাদেশে মাত্রাগতভাবে একটু বেশি। প্রকৃতি মানুষের জন্য আশীর্বাদ। ধর্মাশ্রয়ীদের ভাষায় রহমত। প্রকৃতিকে সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের। কিন্তু, তাদের নানা কর্মকাণ্ড ও সভ্যতার বিকাশের নামে প্রতিনিয়ত আঘাত পড়ছে প্রকৃতির ঘাড়-মাথায়। এতে প্রকৃতির বিগড়াতে বা মাইন্ড করতে কি সময় লাগে? দেশে প্রকৃতি নিয়ে কথা বলা, কাজ করার লোকও কম। পরিবর্তন প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলেও এর ফল সব সময় খারাপ হয় না। কখনো কখনো ভালো কিছুও হয়। প্রকৃতির সব পরিবর্তন সব সময় মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে হয় না। দৃষ্টি ও জ্ঞানের অন্তরালেও হয়। অলক্ষ্যে ঘটা ওই পরিবর্তনের ফল সব সময় জানা হয় না। ওই পরিবর্তনের সুফল-কুফলও থেকে যায় জানার বাইরে। অথবা জানতে জানতে অনেক সময় চলে যায়।
প্রকৃতির পরিবর্তনকে ‘ক্লাইমেট চেঞ্চ’ নামে সম্বোধন করা হয়। পরিবর্তন হলেও প্রকৃতি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না। অভিসম্পাত করে না। নিরপেক্ষ বলতে যা বোঝায় প্রকৃতি সেটাই। প্রকৃতি সবার জন্যই সমান। কাউকে দু’চোখে দেখে না। তবে, একের পাপে সবাইকে তাপে-চাপে ফেলে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা খরা মোটেই প্রকৃতির হেলাখেলা বা লীলা নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার নয়। বরং প্রকৃতির ওপর মানবসৃষ্ট কাজকর্মের ফল। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের বাহাদুরি করে। নিজেকে অতিমানব থেকে কখনো কখনো স্রষ্টাও ভেবে বসে। প্রকৃতির সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বোধকে গলাটিপে মারার বাহাদুরির জের মানুষকেও ভুগতে হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে পরিণামের গভীরে পড়ছে। অমানবিক নানা ঘাতপ্রতিঘাতে ধরণির ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে বিপর্যস্ত করে এখন পরিণাম ভোগার পালা। সাগরকে ভাগাড়, বহতা নদীকে ভরাট পাথরের ঢিবি, সবুজ বনানীকে উৎপাদনসই কলকারখানা বানানোর নিষ্ঠুরতায় প্রকৃতিকেই মেরে ফেলার চর্চা বাংলাদেশসহ অনেক দেশে। পৃথিবীর ফুসফুসে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটিয়ে বন, বৃক্ষ, নদী, পাহাড় এমনকি পশুপাখিদের আবাসস্থলেও মানবজাতির রাজত্বের পরিণাম যা হবার তা-ই হচ্ছে। বৃক্ষনিধন, শিল্প-কারখানা স্থাপন, দূষণ ও নগরায়নের জেরে আবহাওয়ায় দীর্ঘ দূষণ চলছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জনবসতির ওপর প্রতিনিয়ত নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি আঘাত হেনেছে। গবেষকরা বলছেন, গত দশ বছরে বিশ্বে যত বন্যা, ঝড় ও দাবানল হয়েছে তার সবই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে। বাংলাদেশের প্রকৃতিও এর শিকার। অসময়ে বৃষ্টি, বৃষ্টির মৌসুমে খরা, এক এলাকায় বৃষ্টি, আরেক এলাকায় খরা। শীতকালেও শীতের দেখা মেলে না। মানে শীতও মাইন্ড করতে জানে। কথায় কথায় শীতকে কতো গাল দেয়া হয়। শীত না এলে গালমন্দ। আবার এলেও গাল মাফ নাই। ডেকে এনে অপমান। অযৌক্তিক কথাবার্তায় ঋতু সমাজে শীতের একটা নেগেটিভ ইমেজ তৈরি করে ফেলেছে সুবিধাভোগীরাই। প্রকৃতিতে স্বাভাবিকতা থাকলে শীত বা গরম তার ডিসিপ্লিন মতো সবাইকে সার্ভিস দেয়। কখনো কিছু নেয় না। শুধু দেয়। কাউকে নাখোশ করে না।
প্রকৃতির মান ভাঙিয়ে আবার উদার করে তোলার লক্ষণ নেই। বরং প্রকৃতিকে আরো ক্ষেপানোর বিস্তর আয়োজন। মানুষ সমানে নির্গমন করছে ক্ষতিকর গ্যাস যেমন কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, সিএফসি বা ক্লোরোফ্লোরো কার্বনসহ মিথাইল ক্লোরোফর্ম ইত্যাদি। এছাড়া জীবাশ্মকে জ্বালানি হিসেবে পুড়িয়ে তাতে উৎপাদন করা হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড। কৃষিশিল্পের কথিত আধুনিকায়নের ফলে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড বেশি পরিমাণে নির্গত হচ্ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডল তাপ আটকে রাখছে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আশঙ্কা ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে যাবে। নতুন নতুন রোগ, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখন নিয়মিত হয়ে উঠবে। আবহাওয়া হয়ে উঠবে আরও শুষ্ক, আরও উত্তপ্ত । এতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিলুপ্ত হবে বিশেষ প্রজাতির জীব। মানবসমাজও ঝুঁকি ও দুর্যোগের সম্মুখীন হবে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বৃষ্টি ও তাপমাত্রা পরিবর্তনে বাংলাদেশের আক্রান্তের কথা বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। করোনা, ডেঙ্গু, ইবোলা মহামারিসহ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে ভোগান্তি এবং কষ্ট সকল প্রাণীর প্রজননগত বিষয়ে ব্যঘাত করছে। প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে সেখান থেকে নিস্তারের সুযোগ থাকবে না। কবরের আজাব বা দোযখের আগুন; মানুষের বিশ্বাসের বিষয়। দুটোই পরলোকের পর্ব। ইহলোকেই ক’দিন ধরে তাপেচাপে মাত্রা ছাড়ানো আজাবে ভুগছে মানুষ। আগুন সইছে। তাপদহসহ অসুখ-বিসুখে ভুগছে। একদিকে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা আরেকদিকে মানবসৃষ্ট দুর্গতির এ যোগফল সামনে কেবল আজাবের বার্তাই দিচ্ছে। স্বস্তির ভরসা কম। তার ওপর লোডশেডিংয়ের অস্বাভাবিক মাত্রা। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার মাঝে বিদ্যুতের যন্ত্রণা। তারওপর আজ এখানে, কাল সেখানে আগুন লাগছে। আগুন নিজে লাগে, না কেউ লাগিয়ে দেয়- এ নিয়ে বহুকথা আছে। আবিষ্কারের শুরুতেও আগুন কখনো নিজে নিজে জ্বলেনি। ঘষা লেগে কিংবা ঘষা লাগিয়েই জ্বলে উঠতে হয়েছে আগুনকে। একের পর এক আগুনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এসব কথাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে কোনো রুম বা ভবনের ভেতরটা ঠাণ্ডা করলেও গরম হাওয়াটা আরো বেশি করে চলে যাচ্ছে বাইরে। সে কারণে অফিস ও অভিজাতপাড়ার তাপমাত্রা আরো বেশি। এ গরমে পানির সঙ্কটও দেখা দিয়েছে। এর পরিণামে ছড়ছে অসুখ-বিসুখ। জ্বর, সর্দি ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব। শেরে বাংলানগর শিশু হাসপাতাল, মহাখালীর আইসিডিডিআরবির খবর রাখার অবস্থা অনেকের নেই। যারা যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা জানেন কী দশা যাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। আলামত বলছে, আরো দুর্গতি অপেক্ষমান। এরইমাঝে কয়েক দিনের খরায় ধান, পাটসহ সব ধরনের ফসল ফসল নিয়ে কৃষকেরা চরম বিপাকে। ধানের ব্লাস্ট রোগ হয়ে ধানে চিটা হয়ে যাচ্ছে। গরমের সঙ্গে বাতাসে আগুনে হলকা ক্ষেতখামারের কী সর্বনাশ করছে তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যদের বোঝা সম্ভব নয়। বলা হয়ে থাকে- বাজার পুড়লে মাজারও থাকে না; লোকালয়ে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। এ ধরনের আরো অনেক কথার প্রচলন আছে আমাদের সমাজে ও লোক সাহিত্যে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলা পোস্ট | প্রকাশক : বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা |
Posted ১২:৩০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ জুন ২০২৩
banglapostbd.news | S A
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।