মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার | বৃহস্পতিবার, ০১ আগস্ট ২০২৪ | প্রিন্ট | 156 বার পঠিত
সহিংসতা ও প্রা’ণ’হা’নী ঘিরে চলছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। সহিংসতা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ হত্যার দায় নিয়ে সরকারকে পদত্যাগের আহব্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন, সহিংসতায় জড়িত বিএনপি জামায়াত। দায় এড়াতেই দলটি আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের নিরঙ্কুশ বা একচ্ছত্র শাসনামলে বেড়ে ওঠা দেশের তারুণ্যের একটি বড় অংশ নিজেরা নিজেদের রাজাকার’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে। ভাবা যায়? ভুয়া বা জালিয়াতদের কথা আলাদা, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তা কতো দহন করছে? তা কেন, কখন, কোন প্রেক্ষাপটে, কার কারণে তৈরি হলো? পরে তারা এর জবাব দিয়েছে- ’চাইলাম অধিকার- হয়ে গেলাম রাজাকার; তুমি কে আমি কে- রাজাকার- রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে-সরকার সরকার’-স্লোগানের মাধ্যমে। কিসের মধ্যে কী হয়ে গেল-এ প্রশ্নও আছে। এক মাসের মধ্যে দুবার ভারত সফরের পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, কয়েকটি স্মারকচুক্তি স্বাক্ষর, ভারতসহ কোনো কোনো দেশের বেজার হওয়ার গুঞ্জন, একই সময়ে কোটা নিয়ে আদালতের হুকুমনামা, কোটা আন্দোলন আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠা, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর সংক্ষিপ্ত, দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ, এরপর তাদের ওপর ছাত্ররীগের আক্রমণ,লাঠিপেটা, গুলিতে কয়েকজনের প্রানহানি-কিসের মধ্যে কী?
কোটা আন্দোলন পুরোটাই ছিল অরাজনৈতিক। তারা ক্ষমতা চায়নি, সরকারের পদত্যাগও চায়নি। বৈষম্যের সমাধান চেয়েছিল। তাদের চাওয়াটা অযৌক্তিক মনে হলেও আলোচনা করা যেতো। তা না করে অসহিষ্ণুতা, রাজাকারের নাতিপুতি বলে হামলার চরম নিষ্ঠুরতা গোটা পরিস্থিতির বাঁক ঘুরিয়ে দিল। এই হত্যা- নীপিড়নের দরকার ছিল। নাগরিকদের কেউ কোনো কিছু দাবি করলেই তাকে শত্রুপক্ষ বানিয়ে এখন রাজাকারের আকার বাড়িয়ে দেয়া হলো। তারওপর রয়েছে স্বঘোষিত রাজাকার। হোন্ডা-হেলমেট দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এ চেতনা বাস্তবায়ন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরও মাথা হেট করে দিয়েছে। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে ছাত্র-শিক্ষকদের রক্তে ভিজে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ইঞ্চি মাটি গিয়েছিল, যে ক্যাম্পাসে স্তুপ করে রাখা হয়েছিল শহীদদের লাশ; সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদদের উত্তরসূরীরা নিজেদেরকে রাজাকার পরিচয় দিয়ে স্লোগান দিচ্ছে! কী পীড়াদায়ক!
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তুমুল প্রতিবাদ করার অনেক সৃজনশীল স্লোগান ও পদ্ধতি আছে। ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা কোটা পাবে না তো কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’ এমন বক্তব্যে আহত হননি-এমন মানুষের সংখ্যা কম। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও এতে অনেকে আহত। কিন্তু, বাস্তব কারণেই ব্যথার প্রকাশ ঘটাতে পারছেন না। এমন তীর্যক মন্তব্যেরে জেরে শিক্ষার্থীদের মুখে যে তুলে দেয়া হলো- ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানটি-তা সামলাতে গিয়ে এখন নানা কথা। তারওপর হামলা-প্রাণহানি। গোটা শিক্ষাঙ্গনে লক ডাউন। রাজধানীকেন্দ্রিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় গোটা দেশে। গ্রাম-গ্রামান্তরেও।
সরকার এই ইস্যুটিকে খুব দ্রুত সমাধান করতে চায় বলে মনে হচ্ছিল না। কেমন যেন একটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান দিয়ে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছিল। এর মাঝে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর নিদারুণ পরিস্থিতি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি বহু মানুষের সহমর্মিতা আছে। আত্মসম্মান বোধ করা প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধাও চান না কোটাভুক্ত হয়ে অপমানিত হতে। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভূক্ত করায়ও এসব আসল কিন্তু অসৎ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের দায় আছে। তাঁরা ‘আমার সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করেছে’ এরকম প্রত্যয়নপত্র দিয়ে অনেককে সার্টিফিকেট পেতে সহায়তা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান নষ্ট করার অপরাধে এদেরকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার । এছাড়া, ইস্যুটি নিয়ে ল্যাটকা কিছিমের আবেগ দেখানো ব্যাক্তিরাও পরিস্থিতি কম ঘোলাটে করছেন না। তাদের একজন প্রফেসর ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চান না বলে জানিয়েছেন। কারণ সেখানে রাজাকার বেড়ে গেছে। কিসের মধ্যে কী যোগ করে দিলেন এই শিক্ষাবীদও।
তিনি বরং আরো বেশি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারতেন। কথা শুরু করতে পারতেন অভিভাবকের মতো। কেন একটা প্রজন্ম নিজেকে রাজাকার বলে স্লোগান দিতে কুণ্ঠা বোধ করল না-তা বিবেচনায় নিয়ে তাদের বোঝাতে পারতেন। সেটা বোঝাতে হলে তো প্রজন্মের কাছে বেশি বেশি যেতে হবে। রাজনীতির দাওয়াই এবং জেদাজেদিতে কোটা শব্দটিকেই তিতা করে ফেলা হয়েছে। বাস্তবতা ও ন্যায্যতার ধারেকাছেও না গিয়ে গায়ের জোরে পাহাড় ঠেলা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বর্তমান প্রজন্মকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে পরস্পরকে শত্রু বানিয়ে দেয়ার নমুনা অনেক দিন থেকেই স্পষ্ট। রাজনীতির দোকানদারি জমাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দয়া, অনুকম্পা, করুণার পাত্র বানিয়ে হাত পাতায় অভ্যস্থ করার কাজটি রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধীরা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে তা করেছেন স্বাধীনতার পক্ষের দাবিদাররাই। কিছু ব্যাতিক্রম বাদে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক কিছু পায়নি। বাংলাদেশে সামরিক-বেসামরিক আমলারা আমৃত্যু রাষ্ট্রের যে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে তার তুলনায় এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্তি তুলনাতেই আসে না। কিন্তু তাদের দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে আচ্ছা মতো। সম্মান না দিয়ে সম্মানির নামে কিছু ধরিয়ে দেয়ার সুযোগ বেশি নিয়েছে ভুয়ারা। তা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানের ওপর আরো অসম্মান।
একাত্তরে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করা অকুতোভয়রা কোনো সনদের জন্য যুদ্ধ করেনি। তা চিন্তায় আসেনি। যুদ্ধ জয়ের পর তারা ভাতা বা দান-অনুদান পাবেন, সেই ভাবনাও ছিল না। আবার যুদ্ধের পরও কারো সঙ্গে এমন কোন চুক্তি হয়নি। তাদের ছেলে-মেয়ে, নাতিপুতিদের জন্য কোটা রাখতে হবে-সেই বায়নাও হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা যদি ভাতা বা কোটার জন্য যুদ্ধ করে থাকেন, তবে তাদের ছেলে মেয়ে, নাতি-পুতি কেন, জ্ঞাতি -গোষ্ঠির সবারও তা প্রাপ্য। তাদের মন-মননে ছিল কেবলই দেশপ্রেম, দেশ তৈরি। মুক্তিযুদ্ধকে একটি ট্রেডিং এবং একের পর এক ভুয়া তালিকা করে ফেক মুক্তিযোদ্ধা তৈরির দুষ্ট চিন্তাশীল ধরিবাজরা মোজ-মাস্তিতেই আছেন। এই দোকানদারিতে তারা প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে তাদের সন্তানদেরও ভূয়া তালিকাভুক করে দিলেন। তারা এ প্রজন্মের কাছে শত্রু, চক্ষুশূল। গত ক’দিনের কোটাবিরোধী আন্দোলনে তা একদম পরিস্কার। যার জেরে কোটা সংস্কারের কথা চলে এসেছে কোটিা বাতিলে। সেই সাথে নতুন নতুন নানা নোংরা কথা। মুখ ফসকে নয়, গলা ফাটিয়ে বলা হচ্ছে কথাগুলো। বৈষম্য দুর করার জন্য যারা যে যুদ্ধ করেছিল তারাই এখন সে যুদ্ধকে ব্যবহার করে বৈষম্য ও লুটপাটের আইটেম হয়ে যাওয়া বড় কষ্টের। আর রাজার আকার ধরা ভুয়াদের জন্য স্বস্তির ও প্রাপ্তির।
বলার অপেক্ষা রাখে না ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু সবার আগে সুবিধা নিতে পারদর্শী। গণ্ডগোল বা নষ্টের অন্যতম গোড়া এরা। অবশ্য এরা সুযোগ গ্রহিতা। আর দাতা রাজনৈতিক শক্তি। মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের তালিকা তৈরি করতে গিয়েও কম ক্যালেঙ্কারি হয়নি। প্রতিবন্ধী, পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য অবশ্যই কোটা লাগবে। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা অনেক বেশি। একটা ন্যায্য স্তরে নিয়ে আসাটাই হবে বিবেচনার কাজ। এর সমাধানে যেন কোটাও থাকে, আবার কোটার বিরোধিতা তৈরি না হয়। তার আগে, ৫৫০০০ তালিকাভুক্ত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে, সেগুলোকে বাদ দেয়া জরুরি। নইলে সমস্যা জিইয়েই থাকবে। আর সমস্যা জিইয়ে রাখলে একদিকে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে ভাবসাব, পছন্দ না হলেই কাউকে রাজাকার বানানো হবে, বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের তাচ্ছিল্য করার ঢোলে আরো বাড়ি পড়বে। অঘটন আরো পাকবে। নমুনা কিন্তু সে রকমই।
_লেখক : সৃজনশীল প্রকাশক, কলামিস্ট, ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলা_পোস্ট_
Posted ১২:১৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ আগস্ট ২০২৪
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।