নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 132 বার পঠিত
সরকার পতনের একদফা আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কারাবাস শঙ্কায় আছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যেই খোদ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জেলে যাওয়ার শঙ্কার কথা প্রকাশ করেন তার বক্তব্যে।
সবশেষ গত রবিবার পুরনো দুটি নাশকতার মামলায় মির্জা ফখরুল ইসলাম, রুহুল কবীর রিজভী, শিমুল বিশ্বাস, শামা ওবায়েদসহ ৬৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন ঢাকার আদালত।
নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পর সহজে তাদের জামিন মিলছে না। জামিন মিললেও জেলগেট থেকে আবার পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
বর্তমানে ওয়ান-ইলেভেনের সরকার থেকে শুরু করে ২০১৩-১৫ সালে করা মামলার কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কিছু মামলা শেষ প্রান্তে। রাজনৈতিক এসব মামলায় বিএনপি মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, মধ্যমসারির ও তরুণ নেতারা আসামি।
এরই মধ্যে ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা এক মামলায় গত ২ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা মামলায় সম্প্রতি বিচারিক আদালতে বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ৯ বছরের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। পৃথক আরেকটি মামলায় দলটির আরেক নেতা আমানউল্লাহ আমানের ১৩ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়েছে।
দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে এবং একতরফা নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে সরকার প্রতিবারের মতো এবারও মামলা-হামলাকে বেছে নিয়েছে। রাজপথের শক্ত আন্দোলন ব্যাহত করতে নেতাকর্মীকে আদালতপাড়ায় ব্যস্ত রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যেসব মামলা দ্রুত শেষ করে রায় দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সেগুলো মিথ্যা, গায়েবি এবং হয়রানিমূলক। মামলাগুলোতে দুই থেকে তিন হাজার অজ্ঞাত আসামি রাখা হয়। তিনি বলেন, বিরোধী দল দমন করতে আগে পুলিশকে ব্যবহার করা হতো, এখন আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার যদি বিরোধী দল দমনে আদালতকে ব্যবহার করে তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করা হবে এবং ভবিষ্যতে আমরা আদালত মানবো কি না বা আদালতে যাব কি না সি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবো।
বিএনপি সমর্থক আইনজীবী নেতারা অভিযোগ করেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজনৈতিক এসব মামলা দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে। এর পেছনে ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ রয়েছে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির আন্দোলন ঠেকানোর পাশাপাশি নির্বাচনে অযোগ্য করতেই সরকার মামলার কার্যক্রমে তড়িঘড়ি করছে। এতে সরকারের ‘দুরভিসন্ধি’ রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
নিয়মিত হাজিরা দিতে দিতে ক্লান্ত নেতাকর্মীরা। একেকজনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চারশ পর্যন্ত মামলা। কারও বিরুদ্ধে ৫০, কারও বিরুদ্ধে ১০০ মামলা। ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধেও অর্ধশতাধিক মামলা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক নেতাকর্মীকে মাসের কর্মদিবসের প্রায় সবদিনই থাকতে হচ্ছে আদালত প্রাঙ্গণে। তাদের ঠিকানাই যেন কোর্ট-কাচারি।
বিএনপি নেতারা বলছেন, অনেক মামলায় মৃত, প্রবাসী, অসুস্থ আর বয়োবৃদ্ধদেরও আসামি করা হয়েছে। বেছে বেছে দলের সক্রিয় নেতাদের টার্গেট করে তাদের বিরুদ্ধে বেশি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। আবার পুরনো মামলাগুলোকেও সক্রিয় করা হয়েছে। অনেক মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের এ পরিকল্পনা ঠিক থাকলে এক-দুই মাসের মধ্যে বেশ কিছু মামলায় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘ফরমায়েশি’ সাজার রায় দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সম্প্রতি হঠাৎ করেই পুরনো মামলার বিচারে গতি সঞ্চার হয়েছে। প্রতিনিয়ত তাদের দৌড়াতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায়। প্রতিদিন ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে এখন বিএনপি নেতাকর্মীদের ভিড়। এদের মধ্যে কেউ কেউ দিনে একটি- দুটি নয়, ৮ থেকে ১০টি মামলার হাজিরা দিচ্ছেন।
বর্তমানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে ৯৩টি। আর সর্বোচ্চ ৪৫১টি মামলা হয়েছে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে। আর দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৩৭টি।
এছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে সাতটি, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে চারটি, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৪৮টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৩৬টি, নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে ছয়টি, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ছয়টি, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরুদ্ধে ৯টি, সেলিমা রহমানের বিরুদ্ধে চারটি ও সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে।
যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে ৩১৩টি, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবের নামে ৩০৫টি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে ২৫৪টি, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর বিরুদ্ধে ২০৪টি, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে ১৮০টি, নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবির বিরুদ্ধে ১৮৪টি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের বিরুদ্ধে ১৪৭টি, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে ১০৬টি, নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে ১০৩টি মামলা রয়েছে। আরও অনেক নেতার নামে মামলার সংখ্যা সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি পার হয়েছে অনেক আগেই। এখনও নিত্যনতুন মামলা যোগ হচ্ছে।
আইনজীবীরা বলছেন, বিএনপি নেতাদের মাসে সব কর্মদিবসের প্রতিদিনই আদালতে আসতে হচ্ছে। কারও কারও প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি মামলার শুনানি থাকায় সকাল-সন্ধ্যা আদালতেই কাটাতে হচ্ছে। আদালতই এখন বিএনপি নেতাদের কর্মস্থল ও অফিসে পরিণত হয়েছে। এসব মামলায় কারও শুনানি শেষ পর্যায়ে, আবার কারও সবে শুরু হয়েছে। কেউ আসছেন জামিন নিতে, আবার কেউ হাজিরা দিতে। এভাবেই দিনের পুরোটা সময় আদালত অঙ্গনে কাটাতে হয় তাদের।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকার নিজেদের অবস্থা সংহত করতে বহু পুরনো মামলা দিয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সাজা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এক ধরনের নার্ভাস থেকে সরকার অস্থিরতায় ভুগছে। আজ শুধু দেশ নয়, সারা বিশ্ব এ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এরা যতই চেষ্টা করুক ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন করতে পারবে না। এসব করে কোনো লাভ নেই। যতদিন যাচ্ছে এই সরকারের পতন তত স্পষ্ট হয়ে আসছে।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম বলেন, এ মামলা ও সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রমাণ করে আ.লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। তারা নির্বাচনের আগে মাঠ খালি করতে চায়। পাশাপাশি আমি বলব, আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট যারা এ সরকারের অধীনে নির্বাচন যাওয়ার কথা বলেন, তারা কেন এখন চুপ করে আছেন। একদিকে নির্বাচনে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে রাখছে, আবার বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে বলছে, এ দুমুখো নীতি আওয়ামী লীগের দ্বারাই সম্ভব।
ঢাকা পোস্ট/এমআর/তাওসি
Posted ১০:২৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩
banglapostbd.news | Rubel Mia
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
৭৮/৩ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, ঢাকা-১০০০।